সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে কর ও শ্রমসংক্রান্ত আরও ৫০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে করসংক্রান্ত ৩১টি এবং শ্রম আদালত ও শ্রম অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে ১৯টি মামলা রয়েছে। এই তথ্য সামনে আসে গত ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একটি রায়ের পর, যেখানে ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই রায়ের পর ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়ের করা মামলাগুলো বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় নতুন রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
৬৬৬ কোটি টাকার কর মামলাটি দীর্ঘদিনের। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ এই পাঁচ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা আয়কর দাবি করে। মূল বিরোধটি গ্রামীণফোনের কাছ থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ নিয়ে। গ্রামীণ কল্যাণ দাবি করে, গ্রামীণফোন লভ্যাংশ থেকে ১৫ শতাংশ উৎস কর কেটে নিয়েছে, তাই এর ওপর আবার কর আরোপ করা বৈধ নয়। কিন্তু এনবিআর বলছে, ওই অর্থ আসলে লভ্যাংশ নয়, বিনিয়োগের ওপর ফেরত, যা ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ হিসেবে করযোগ্য। ২০১৭ সালে গ্রামীণ কল্যাণ হাইকোর্টে দুটি রিট দায়ের করে এনবিআরের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে। দীর্ঘ শুনানির পর গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ রিট দুটি খারিজ করে দেন, ফলে এনবিআরের দাবি বহাল থাকে। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুস সামাদ আজাদ জানিয়েছেন, রায়ের সার্টিফায়েড কপি পাওয়ার পর এনবিআর গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকার কর দাবি করে নোটিশ পাঠাবে এবং আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধের সময় দেওয়া হবে। ২০১৭ সাল থেকে সরল সুদও যোগ হবে।
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গ্রামীণ কল্যাণের রিট খারিজের ফলে এনবিআরের কর দাবি আইনগতভাবে বহাল থাকল। ড. ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, তারা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। আপিল বিভাগ যদি হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দেয়, তাহলে গ্রামীণ কল্যাণকে আপাতত টাকা পরিশোধ করতে হবে না। তবে আপিল বিভাগ রায় বহাল রাখলে প্রতিষ্ঠানটিকে অর্থ পরিশোধ করতে হবে। উল্লেখ্য, এই মামলার নজিরও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ একই রিট খারিজ করে রায় দিয়েছিল, কিন্তু ওই বেঞ্চের একজন বিচারপতি আগে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে সরকারের পক্ষে মামলা পরিচালনা করায় স্বার্থের সংঘাতের কারণে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট রায়টি প্রত্যাহার করা হয় এবং মামলাটি নতুন বেঞ্চে পাঠানো হয়। নতুন বেঞ্চ গত ১০ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত রায় দেন।
শুধু কর মামলা নয়, শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগেও ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন। গ্রামীণ কমিউনিকেশন্সের চাকরিচ্যুত ১০১ জন শ্রমিক-কর্মচারীর অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে এই মামলাগুলো দায়ের করা হয়। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, শ্রমিকদের স্থায়ী না করা, শ্রমিকদের অংশগ্রহণ তহবিল ও কল্যাণ তহবিল গঠন না করা, এবং লভ্যাংশের ৫ শতাংশ শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণ না করা। ২০২৬ সালের ২ মার্চ ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত ড. ইউনূসসহ সংশ্লিষ্টদের ১৮টি নতুন মামলায় ব্যাখ্যা দিতে সমন জারি করে। জানা গেছে, এই মামলাগুলোর কিছু আপিল বিভাগের আদেশে স্থগিত রয়েছে, আবার কিছু মামলা নিয়মিত শুনানির মধ্য দিয়ে চলছে। শ্রম আদালতের বাইরে শ্রম আপিলেট ট্রাইব্যুনালেও একাধিক মামলা বিচারাধীন।
ড. ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুনের অভিযোগ, তার মক্কেল ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ শিকার হচ্ছেন এবং বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের পথেই হাঁটছে। তিনি জানিয়েছেন, ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য স্পষ্ট, আদালতের রায়ের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই, উচ্চ আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটিই কার্যকর হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। প্রসঙ্গত, ২০১০-১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ড. ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ১৭০টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিচারিক প্রক্রিয়ায় তিনি বেশিরভাগ মামলা থেকে অব্যাহতি পান। এখন নতুন করে মামলাগুলো নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় ড. ইউনূসের আইনি লড়াই আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

