এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবির মামলায় কারাগারে থাকা চার আসামি আদালতে একটি ‘যৌথ অংশীদারি বিনিয়োগ চুক্তিপত্র’ দেখিয়ে জামিন পেয়েছিলেন। ওই নথিতে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আজিবর রহমানের সঙ্গে তাঁদের ব্যবসায়িক সম্পর্কের কথা বলা হয়।
তবে পরে আজিবর রহমান জানান, এমন কোনো চুক্তির কথা তিনি জানেন না। পুলিশের তদন্তেও তাঁর সঙ্গে আসামিদের কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন বা চুক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্ত কর্মকর্তা নথিটিকে জাল বলে উল্লেখ করেছেন।
এরপর আদালত চার আসামির জামিন বাতিল করে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একই সঙ্গে জাল নথি তৈরি ও ব্যবহার, আদালতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং প্রতারণার অভিযোগে নতুন মামলা করা হয়।
এক কোটি টাকা মুক্তিপণের অভিযোগ
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ৯ জুন উত্তরা পশ্চিম থানার ৩ নম্বর সেক্টর এলাকা থেকে আজিবর রহমানকে একটি সাদা গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় আটকে রেখে মারধর করা হয় বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
অপহরণকারীরা তাঁর পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। ১১ জুন আজিবরের স্বজনেরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। ওই রাতেই তাঁর মেসেঞ্জার থেকে স্ত্রীর কাছে ভিডিও কল আসে। সেখানে তাঁকে আটকে রেখে মারধর করতে দেখা যায়।
স্বজনেরা পরে ২৫ লাখ টাকা জোগাড় করেন। এর মধ্যে ১৪ জুন দক্ষিণখানের একটি ডাচ্ বাংলা ব্যাংক হিসাবে ২০ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়। একই হিসাবে আরও ৫ লাখ টাকা পাঠানো হয়।
টাকা পাওয়ার পরও অপহরণকারীরা আজিবরকে ছেড়ে দেয়নি। পরে পুলিশ হালান অটোস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ছয়জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
চুক্তিপত্র দেখিয়ে জামিন
গ্রেপ্তার চার আসামির পক্ষে ১৮ জুন জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী শাহ মোহাম্মদ শাহীন হাসান। ২২ জুন শুনানির সময় আদালতে ‘যৌথ অংশীদারি বিনিয়োগ চুক্তিপত্র’ নামে একটি নথি দাখিল করা হয়।
নথিতে আজিবর রহমানের সঙ্গে আসামিদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও লেনদেনের কথা উল্লেখ ছিল। সেটি বিবেচনায় নিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাঁদের জামিন দেন।
তবে ২৬ জুলাই মামলার ধার্য তারিখে আজিবর ও তাঁর ভাগনে জহুরুল ইসলাম আদালতকে জানান, আসামিদের সঙ্গে তাঁদের কোনো আপস বা ব্যবসায়িক চুক্তি হয়নি। ওই নথির বিষয়েও তাঁরা কিছু জানেন না।
এরপর আদালত নথিটির সত্যতা যাচাই করতে উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই মেহেদী হাসানকে তদন্তের নির্দেশ দেন। ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
তদন্তে মেলেনি চুক্তির প্রমাণ
তদন্তে পুলিশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আল ফারাবি ট্রেডার্স লিমিটেডের মালিক শরিফুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তিনিও জানান, ওই প্রতিষ্ঠানে এমন কোনো চুক্তি হয়নি।
ভুক্তভোগী আজিবর রহমান ও বাদী জহুরুল ইসলামও একই কথা জানান। ৮ আগস্ট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন এসআই মেহেদী হাসান। তাঁর ভাষ্য, আজিবরের সঙ্গে আসামিদের কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন বা চুক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যেই আজিবরকে অপহরণ করা হয়েছিল। আদালতে দাখিল করা চুক্তিপত্রের পক্ষে আসামিরা কোনো প্রত্যক্ষ বা দালিলিক প্রমাণও দিতে পারেননি।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ মোহাম্মদ শাহীন হাসান এই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, নথিটি আসল এবং আসামিদের সঙ্গে আজিবরের ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য তাঁকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল, মুক্তিপণের জন্য নয়।
নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দুজন
জামিন পাওয়ার পর ৯ আগস্ট আসামিদের আদালতে হাজির হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাঁরা হাজির হননি। পরে আদালত জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
জাল নথি দাখিল ও প্রতারণার অভিযোগে ১৩ আগস্ট উত্তরা পশ্চিম থানায় নতুন মামলা হয়। এতে দণ্ডবিধির ১৮১, ১৮২, ৪৬৫, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৩৪ ও ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
নতুন মামলাটি এখন তদন্ত করছে কোতোয়ালি থানা। তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ মামলায় দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিরা পলাতক।
জাল নথিটি কীভাবে তৈরি হয়েছে, কারা এটি তৈরি ও আদালতে দাখিলের সঙ্গে জড়িত এবং এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। নতুন মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখ ২১ সেপ্টেম্বর।

