সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার বেড়েছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে নতুন রিটের প্রায় দ্বিগুণ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল মনে করেন, বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে হাইকোর্টে রিট মামলার চাপ আরও কমবে। ব্যক্তিগত বিরোধ বা ব্যক্তিস্বার্থে রিট করার প্রবণতা বন্ধ করাও জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি।
জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে নতুন রিট মামলা হয় ৪ হাজার ১১২টি। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ২১৩টি মামলা।
এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত নতুন রিট মামলা হয় ৪ হাজার ৭২৯টি। এই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯ হাজার ৫৯০টি মামলা। অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকে নতুন মামলার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ রিট নিষ্পত্তি হয়েছে।
জুনের শেষে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টিতে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থ মামলার নামে ব্যক্তিস্বার্থে রিট করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এসব মামলার একটি অংশ আত্মপ্রচারের উদ্দেশ্যেও করা হয়।
তিনি বলেন, সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় হাইকোর্টের জন্য বাধ্যতামূলক। কোন ধরনের মামলা হাইকোর্ট গ্রহণ করতে পারে, সে বিষয়েও আপিল বিভাগের একাধিক রায় রয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে কিছু ক্ষেত্রে রিট গ্রহণ করা হচ্ছে। এর ফলে বিচারিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। এই জায়গায় শৃঙ্খলা আনা গেলে রিট মামলার সংখ্যা কমবে।
ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়েও সরাসরি হাইকোর্টে রিট করার প্রবণতার কথা উল্লেখ করেন তিনি। জমি দখল, জমির সীমানা বা বিল ও বাঁওড় নিয়ে বিরোধের মতো বিষয়ে অনেকে সরাসরি রিট করছেন। অথচ এসব ক্ষেত্রে সাধারণত নিম্ন আদালতে গিয়ে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি হাইকোর্টে আসার কারণে রিট মামলার সংখ্যা বাড়ছে।
### সংবিধানে পাঁচ ধরনের রিট
বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে হাইকোর্টে রিট করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হেবিয়াস করপাস, ম্যান্ডামাস, সার্টিওরারি, প্রহিবিশন ও কো ওয়ারেন্টো।
হেবিয়াস করপাস রিট করা যায় কাউকে বেআইনিভাবে আটক করা হলে। এ ক্ষেত্রে আটক ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিতে পারেন হাইকোর্ট।
ম্যান্ডামাস রিটের মাধ্যমে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানকে আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া যায়।
কোনো বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনবহির্ভূতভাবে আদেশ দিলে তা বাতিলের জন্য সার্টিওরারি রিট করা যায়।
বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনগত ক্ষমতার বাইরে কোনো মামলা পরিচালনা করলে সেই কার্যক্রম বন্ধের জন্য প্রহিবিশন রিট করা যায়।
কেউ আইনগত যোগ্যতা ছাড়া কোনো সরকারি পদে থাকলে কো ওয়ারেন্টো রিটের মাধ্যমে তাঁর ওই পদে থাকার বৈধতা যাচাই করা যায়।
### জনস্বার্থে রিটের ভূমিকা
মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ের মাধ্যমে দেশে জনস্বার্থে রিটের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়। ওই রায়ে বলা হয়, জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর কোনো ঘটনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে যেতে পারে।
এরপর জনস্বার্থে রিট দেশের বিচার ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন সময়ে এসব মামলার মাধ্যমে নদী দখল, অবৈধ ইটভাটা, পাহাড় কাটা, জনস্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য এবং নারী ও শিশুর অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ এসেছে।
রিট মামলার মাধ্যমে দেশের নদীগুলোকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক ক্ষতিপূরণ এবং প্রান্তিক মানুষের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষাতেও রিটের ভূমিকা রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে একজনের করা রিটের রায় বা আদেশের সুফল পরে দেশের হাজারো মানুষ পেয়েছেন।

