বিশ্লেষণ
সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখ জাতীয় সংসদে পাস হলো স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, যার মধ্য দিয়ে বিলুপ্ত হলো বিতর্কিত র্যাব। কিন্তু জন্ম নিলো পুলিশের অধীনে নতুন এক বিশেষায়িত বাহিনী। কিন্তু আইনটির খুঁটিনাটি ঘেঁটে দেখলে বোঝা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় বদল যতটা এসেছে, সেই তুলনায় জবাবদিহির কাঠামোয় বদল আসেনি প্রায় কিছুই। আর এই প্যাটার্নটা নতুন নয়, এটা বাংলাদেশ পুলিশের ১৬৫ বছরের ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা।
পুলিশের চরিত্রের ইতিহাস
আজকের বাংলাদেশ পুলিশ যে আইনি কাঠামোয় চলে, তার মূল ভিত্তি ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন। সিপাহি বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে আইরিশ কনস্টেবুলারি মডেলে তৈরি একটা আইন, যার লক্ষ্যই ছিল জনগণের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ক্ষমতাসীন শাসনকে সুরক্ষা দেওয়া।
বাংলাদেশের পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনের নির্দেশ মানা ও মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগের শিকড় ব্রিটিশ আমলে। ১৭৯৩ সালে চালু হওয়া পুলিশব্যবস্থায় দারোগার বেতন ছিল মাত্র ২৫ টাকা, তবে ডাকাত ধরলে পুরস্কার ও উদ্ধার করা চোরাই মালের ১০ শতাংশ পেতেন। ফলে ধরপাকড়, জোর করে স্বীকারোক্তি ও ঘুষ আয়ের পথ হয়ে ওঠে।
পুলিশ আইনের ৪ ধারায় স্পষ্ট লেখা আছে, জেলার পুলিশ চলবে জেলা প্রশাসনের সাধারণ নিয়ন্ত্রণে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে আইনের ভাষায় ছোটখাটো পরিবর্তন, যেমন “প্রাদেশিক সরকার” থেকে “সরকার”, আনা হলেও এই মৌলিক কাঠামোগত সম্পর্ক অপরিবর্তিত রয়ে গেছে আজ পর্যন্ত।
এর ফল হলো যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির লাগাম থাকে নির্বাহী বিভাগের হাতেই, স্বাধীন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির আওতায় নয়। সাম্প্রতিক একটা ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট ওসির অডিও বিতর্ক, যার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি, ঘিরে পদায়নে অর্থ লেনদেনের যে অভিযোগ উঠেছে, সেটা এই কাঠামোগত দুর্বলতারই একটা লক্ষণ। সমস্যাটা একজন কর্মকর্তার সততার নয়, বরং এমন একটা ব্যবস্থার, যেখানে জবাবদিহির কোনো স্বাধীন স্তর নেই।
সংস্কারের বারবার ব্যর্থ হওয়া প্রচেষ্টা
আইনি কাঠামো বদলানোর চেষ্টা এই প্রথম নয়। ১৯৮৮ সালের পুলিশ কমিশন ব্যাপক দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি চিহ্নিত করেছিল। ২০০৭ সালে একটা খসড়া পুলিশ অধ্যাদেশ তৈরি হয়েছিল, যাতে ছিল জাতীয় পুলিশ কমিশনের প্রস্তাব। কিন্তু সেটা মন্ত্রণালয়ে আটকে ছিল বছরের পর বছর। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় তিন কোটি ডলারের একটা প্রকল্পও, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত, এই খসড়াকে এগিয়ে নিতে পারেনি। নিজস্ব মূল্যায়নেই লেখা হয়েছিল, স্বার্থান্বেষী মহল এটা আটকে রেখেছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যে প্যাটার্নটা দেখা গেছে, সেটা আরও স্পষ্ট করে দেখায় প্রস্তাবিত প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ধাপে ধাপে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়া। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রথম খসড়ায় পুলিশ কমিশন ছিল নয় সদস্যের, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ঘোষিত, আইজিপি নিয়োগে বাধ্যতামূলক প্যানেল ব্যবস্থাসহ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে গিয়ে সেটা নেমে আসে সাত সদস্যে, “স্বাধীন ও নিরপেক্ষ” শব্দ দুটো বাদ পড়ে, নিয়োগ বদলির ক্ষমতা থেকে যায় মন্ত্রণালয়েরই হাতে। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জারি হওয়া অধ্যাদেশে কমিশন নেমে আসে পাঁচ সদস্যে এবং কার্যত পরামর্শমূলক একটা প্রতিষ্ঠানে। মূল খসড়া থেকে টিকে থাকে শুধু আইজিপি নিয়োগের প্যানেল ব্যবস্থা।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ আছে: এই দুর্বল অধ্যাদেশও পরে বিএনপি সরকারের সময়ে সাংবিধানিক মেয়াদ পার হয়ে যাওয়ায় বাতিল হয়ে যায় এবং বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় যে বিএনপি নিজেই আটসদস্যের পুলিশ কমিশন ও র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাব দিয়েছিল, ক্ষমতায় এসে সেই আইন পুনরুজ্জীবিত করার তাগিদ দেখায়নি। এটা এই খাতের সংস্কার প্রচেষ্টার একটা কাঠামোগত সমস্যাকেই তুলে ধরে। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় পুলিশের ওপর নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ কমানোর দাবি যতটা জোরালো থাকে, ক্ষমতায় গেলে সেই একই নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার আগ্রহ ততটাই কমে যায়।
এসআরবি আইন: পুরনো প্রশ্নের নতুন সংস্করণ
সেপ্টেম্বরে পাস হওয়া এসআরবি আইনের ২৭ ধারায় র্যাবের জনবল, ক্ষমতা, সম্পত্তি ও চলমান মামলা সরাসরি হস্তান্তরিত হয়েছে নতুন বাহিনীতে। কিন্তু কোনো সদস্যের অতীত কার্যক্রম যাচাইয়ের কোনো বিধান আইনে নেই। গুম কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী তদন্তকৃত ১,৫৬৯টা গুমের ২৫ শতাংশে র্যাবের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এই প্রেক্ষাপটে যাচাই প্রক্রিয়া ছাড়া পুরো বাহিনীর হস্তান্তর আইনগতভাবে একটা বড় ফাঁক রেখে দেয়। এটা মূলত ২০০৪ সালে র্যাব গঠনের সময়কার প্যাটার্নেরই পুনরাবৃত্তি। তখনও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন সংশোধন করে একটা নতুন বাহিনী গড়া হয়েছিল বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরেই, নতুন কোনো স্বাধীন জবাবদিহি ব্যবস্থা যোগ না করেই।
কাঠামোগত সমস্যা বনাম মানুষ বদলানো
গত সাত মাসে ক্ষমতাসীন সরকার পুলিশের শীর্ষ পদগুলোতে, আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার, রদবদল করেছে, ৮৫ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। এই ক্ষমতাটাও প্রাসঙ্গিক, কারণ ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হলে সরকার কোনো কারণ না দেখিয়েই কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠাতে পারে। যা একদিকে জবাবদিহিহীন কর্মকর্তা অপসারণের হাতিয়ার, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসারও সুযোগ তৈরি করে। জুলাই অভ্যুত্থানের মামলায় অভিযুক্ত প্রায় দেড় হাজার পুলিশ সদস্যের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র ৬৮ জন। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির আনুষ্ঠানিক পথ, আদালতে প্রমাণ, সবচেয়ে ধীরগতির থেকে গেছে, যেখানে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ, অবসর ও বদলি, হয়েছে তুলনামূলক দ্রুত।
সামনে কী
জুলাই সনদে ৩০টা রাজনৈতিক দল স্বাধীন পুলিশ কমিশনের একটা রূপরেখায় একমত হয়েছিল, কিন্তু এই প্রস্তাব সংবিধান সংশোধনী তালিকার বাইরে থাকায় এর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সাধারণ আইন প্রণয়নের ওপর। যেটা প্রতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক পর্যায়ে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে একটা কার্যকর কাঠামোগত সংস্কারের জন্য অন্তত ছয়টা উপাদান প্রয়োজন: ১৮৬১ সালের আইন প্রতিস্থাপন করে প্রকৃত স্বাধীন পুলিশ কমিশন ও আইজিপি নিয়োগে প্যানেল ব্যবস্থা, ওসি এসপি পদে নির্দিষ্ট মেয়াদ ও স্বচ্ছ বদলি, পুলিশের বাইরের স্বাধীন অভিযোগ কর্তৃপক্ষ, এসআরবিতে সব পদে যাচাই প্রক্রিয়াসহ নতুন নিয়োগ, দলীয় বিবেচনা নয় ব্যক্তির আচরণ ভিত্তিক যাচাই বোর্ড এবং ডিজিএফআইয়ের কার্যপরিধি আইন দিয়ে সীমিত করা ও সংসদীয় তদারকি।
এর মধ্যে প্রশাসনিক আদেশে করা সম্ভব এমন উপাদান আছে, যেমন বদলি নীতি। আবার আইন প্রণয়নের প্রয়োজন এমনটাও আছে, যেগুলো বাস্তবায়নে সময় লাগবে এক থেকে তিন বছর।
মূল প্রশ্নটা তাই আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতার নয়, রাজনৈতিক ইচ্ছার। কারণ প্রতিটা রাজনৈতিক দলই বিরোধী দলে থাকার সময় যে সুরক্ষার দাবি তোলে, ক্ষমতায় গিয়ে সেই একই সুরক্ষা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বেঁধে দিতে ইতিহাসে কোনো সরকারই আগ্রহ দেখায়নি।

