কোনো উত্তরাধিকার সনদ পরে বাতিল হলেও সেই সনদের ভিত্তিতে সরল বিশ্বাসে করা আগের শেয়ার লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হয়ে যায় না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, সনদ কার্যকর থাকার সময় সরল বিশ্বাসে হওয়া প্রতিটি লেনদেনকে পেছনের তারিখ থেকে অবৈধ ঘোষণা করা যাবে না। তবে লেনদেনের সময় সংশ্লিষ্ট কোম্পানি সনদের ত্রুটির কথা জানত, কিংবা সরল বিশ্বাসে কাজ করেনি, এমন বিষয় প্রমাণিত হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
‘আবু তাবের ও অন্যান্য বনাম নিউটেক্স গ্রুপ অব কোম্পানিজ ও অন্যান্য’ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. তৌফিক ইনামের একক বেঞ্চ গত ১৫ সেপ্টেম্বর এ রায় দেন। কোম্পানি ম্যাটারের এই মামলার ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি গত ১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, মৃত আবুল কাসেম বাবুল চারটি কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার ছিলেন। ১৯৯৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ২০০০ সালের ১৬ মে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের নামে একটি উত্তরাধিকার সনদ দেওয়া হয়। পরে ওই সনদ বাতিলের জন্য মামলা হলে ২০১২ সালে তা বাতিল হয়। একই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি আবেদনকারীদের নামে নতুন উত্তরাধিকার সনদ দেওয়া হয়।
আবেদনকারীদের দাবি, বাবুলের বাবা হাজী আবুল খায়েরও উত্তরাধিকারী ছিলেন। তাঁর সূত্রে আবেদনকারীরা ওই কোম্পানিগুলোর শেয়ারের অংশীদার হয়েছেন। তাই তাঁরা শেয়ারহোল্ডার রেজিস্টারে নিজেদের নাম তোলার আবেদন করেন। কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০০০ সালের সনদের ভিত্তিতে পরে সমঝোতা স্মারক, সালিশি কার্যক্রম ও শেয়ার হস্তান্তরের মাধ্যমে নানা লেনদেন হয়েছে। এসব লেনদেনের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অর্থও পরিশোধ করেছেন।
মামলায় দেখা যায়, ২০০১ সালে হওয়া লেনদেনের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে কোম্পানি আইনের ৪৩ ধারায় রেজিস্টার সংশোধনের আবেদন করা হয়। আবেদনকারীরা ২০০৮ সালে প্রথম ওই উত্তরাধিকার সনদের কথা জানতে পারেন। ২০১২ সালে সেটি বাতিল হওয়ার পর তাঁরা নতুন সনদ পান।
হাইকোর্ট বলেন, ৪৩ ধারায় শেয়ারহোল্ডার রেজিস্টার সংশোধনের ক্ষেত্রে আদালতের ক্ষমতা বিস্তৃত। কিন্তু এই ধারা সব ধরনের মালিকানা, চুক্তি বা দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তির বিকল্প নয়। রেজিস্টার সংশোধনের আবেদনে প্রয়োজনে মালিকানার প্রশ্ন নির্ধারণ করা যেতে পারে। তবে পুরোনো চুক্তি বাতিল, সালিশি কার্যক্রমের বৈধতা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের মাধ্যমে শেয়ার হস্তান্তর, জালিয়াতি, উত্তরাধিকার এবং একাধিক পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বী স্বত্বের মতো জটিল বিষয় থাকলে তার নিষ্পত্তির জন্য পৃথক দেওয়ানি কার্যক্রম প্রয়োজন হতে পারে।
আদালত আরও বলেন, দীর্ঘ বিলম্বও এ ধরনের প্রতিকার দেওয়ার সময় বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে এর মধ্যে তৃতীয় পক্ষের অধিকার তৈরি হলে, অর্থ পরিশোধ হলে এবং দীর্ঘদিন ধরে রেজিস্টারে কোনো নাম বহাল থাকলে আদালতকে সতর্ক থাকতে হবে।
উত্তরাধিকার সনদ বাতিলের প্রভাব নিয়ে হাইকোর্ট বলেন, সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুযায়ী কোম্পানির শেয়ার ‘সিকিউরিটি’ হিসেবে বিবেচিত হয়। উত্তরাধিকার সনদের ভিত্তিতে সরল বিশ্বাসে হওয়া লেনদেনের ক্ষেত্রে আইনে নির্দিষ্ট সুরক্ষা আছে। তাই পরে সনদ বাতিল হলেই আগের সব লেনদেন অবৈধ হয়ে যায় না। তবে আবেদনকারীকে প্রমাণ করতে হবে যে কোম্পানি সনদের ত্রুটির কথা জানত, কিংবা লেনদেনের সময় তারা সরল বিশ্বাসে কাজ করেনি।
মামলার সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট মনে করেন, রেজিস্টারে বর্তমানে থাকা নামগুলো ‘পর্যাপ্ত কারণ ছাড়া’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, তা আবেদনকারীরা প্রমাণ করতে পারেননি। আদালত বলেন, ২০০১ সালে কোম্পানিগুলোর কাছে কার্যকর উত্তরাধিকার সনদ ছিল। ওই সময় তারা সনদের কোনো ত্রুটি বা অন্য কারও শ্রেষ্ঠ দাবির কথা জানত, এর পর্যাপ্ত প্রমাণও মেলেনি। এ ছাড়া আবেদনকারীদের দাবি মানতে হলে সমঝোতা স্মারক, সালিশি কার্যক্রম, শেয়ার হস্তান্তর, অপ্রাপ্তবয়স্কদের সক্ষমতা ও সংশ্লিষ্টদের অধিকারসহ একাধিক জটিল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি দরকার। শুধু রেজিস্টার সংশোধনের আবেদনে সেসব নিষ্পত্তি করা উপযুক্ত নয় বলে আদালত মত দেন।
ফলে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ৪৩ ধারায় করা আবেদন খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। তবে আদালত স্পষ্ট করে বলেন, এ রায়ে আবেদনকারীদের সম্ভাব্য কোনো স্বতন্ত্র মৌলিক বা আইনগত অধিকার চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়নি। তাঁরা আইন অনুযায়ী পৃথক কার্যক্রম নিয়ে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাবেন। আদালত কোনো খরচের আদেশ দেননি। মামলায় চলমান কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ থাকলে তা বাতিল করা হয়েছে।
রায়ের তাৎপর্য শুধু এই মামলায় সীমিত নয়। শেয়ারবাজার ও কোম্পানি ব্যবস্থাপনায় লেনদেনের নিশ্চয়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো কোম্পানি বৈধ মনে হওয়া সনদ দেখে শেয়ার হস্তান্তর করলে পরে সেই সনদ বাতিল হওয়ায় যদি সব লেনদেন উল্টে যেত, তাহলে কোম্পানি ও ক্রেতা, দুই পক্ষই অনিশ্চয়তায় পড়ত। এই রায় সরল বিশ্বাসে কাজ করা পক্ষকে সুরক্ষা দেয়। আবার দাবি প্রমাণের দায় আবেদনকারীর ওপর রেখে বোঝানো হয়েছে, শুধু সনদ বাতিল হলেই লেনদেন ফেরানো যাবে না।
আবেদনকারীদের জন্য রায়টি পুরোপুরি পথ বন্ধ করেনি। পৃথক দেওয়ানি মামলার সুযোগ খোলা আছে। তবে ২০০১ সালের লেনদেন নিয়ে বহু বছর পর আইনি লড়াই চালাতে হলে বিলম্ব, তৃতীয় পক্ষের অধিকার ও অর্থ পরিশোধের মতো বিষয় সেখানেও প্রভাব ফেলতে পারে। পৃথক মামলায় আদালত কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা এখনই বলা যায় না। এসব বিষয়ে রায়ে সুনির্দিষ্ট কোনো মত দেওয়া হয়নি।
এখন নজর থাকবে আবেদনকারীরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন কি না, কিংবা পৃথক দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন কি না, সেদিকে। এ রায় ভবিষ্যতে একই ধরনের শেয়ার ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত মামলায় কতটা নজির হিসেবে কাজ করে, সেটিও দেখার বিষয়।

