সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে মানবিক সহায়তাকারীর বিরুদ্ধে দুর্ঘটনাজনিত কোনো ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা করা যাবে না। এমনকি আহত ব্যক্তির মৃত্যু হলেও শুধু তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার কারণে উদ্ধারকারীকে দায়ী করা যাবে না। সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০২৬-এর খসড়ায় ‘গুড সামারিটান’ বা মানবিক উদ্ধারকারীদের জন্য এই আইনি সুরক্ষার প্রস্তাব করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, আহত মানুষের জীবন রক্ষা এবং উদ্ধারকাজে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো।
দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টা আহত ব্যক্তির জীবন রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ সময়কে বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’। এ সময়ের মধ্যে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া গেলে প্রাণহানি ও গুরুতর শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটা কমানো যায়। কিন্তু পুলিশি ঝামেলা, মামলা বা আদালতে হাজিরার আশঙ্কায় অনেক সময় সাধারণ মানুষ আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে আগ্রহী হন না। ফলে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেকের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, কেউ সৎ উদ্দেশ্যে ও মানবিক বিবেচনায় আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার, প্রাথমিক সহায়তা বা হাসপাতালে স্থানান্তর করলে ওই সহায়তার ফলে ঘটা ক্ষতি বা মৃত্যুর জন্য তাঁকে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলায় দায়ী করা যাবে না।
বর্তমানে সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এর ৬২ ধারায় দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত মোটরযানের চালক, কন্ডাক্টর বা তাঁদের প্রতিনিধির ওপর দায়িত্ব রয়েছে। তাঁদের নিকটস্থ থানায় খবর দিতে হয় এবং আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়। এ বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড, ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। তবে সাধারণ নাগরিকের মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট আইনি সুরক্ষা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, আইনি জটিলতার ভয়ে সাধারণ মানুষ যেন আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে পিছিয়ে না যান, সে জন্য কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা জরুরি। গুড সামারিটান সুরক্ষার প্রস্তাবের মাধ্যমে উদ্ধারকারীকে নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তাহমিদুর রহমান মনে করেন, মানবিক কারণে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া মানুষদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হলে তা জনসাধারণকে উদ্ধারকাজে উৎসাহিত করতে পারে। তবে প্রকৃত মানবিক সহায়তা এবং ইচ্ছাকৃত ক্ষতি বা গুরুতর অবহেলার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে আইনে সুরক্ষার পরিধি স্পষ্ট থাকা দরকার।
খসড়ায় দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কমিউনিটি ভলান্টিয়ার ও অ্যাম্বুলেন্স টিম গঠনের কথা বলা হয়েছে। এসব দল খবর পাওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করবে। আহত ব্যক্তিকে উপযুক্ত হাসপাতালে নেওয়া এবং গোল্ডেন আওয়ারের মধ্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। জরুরি অবস্থায় আহত ব্যক্তির প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার আওতায় হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রগুলোকে আনার প্রস্তাবও রয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যমান আইনের ৬২ ধারায় দেশব্যাপী টোল-ফ্রি টেলিফোন নম্বর চালুর বিধান আছে। এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষদর্শী, চালক, মালিক, যাত্রী ও সংশ্লিষ্টরা জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবার জন্য সহায়তা চাইতে পারবেন। তবে কার্যকর উদ্ধারব্যবস্থার জন্য পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী, হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসা সক্ষমতা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও দরকার।
দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে খসড়ায়। সড়কের নকশা, নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে। ভুল নকশা বা অনিরাপদ অবকাঠামোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণ করে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পথচারীদের নিরাপত্তায় ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী উভয়ের জন্য হেলমেট বাধ্যতামূলক করা, শিশু পরিবহণে নিরাপত্তা বিধিমালা প্রণয়ন এবং সাইকেল আরোহীদের জন্য আলাদা লেন তৈরির প্রস্তাবও আছে। নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের উপযোগী সড়ক ও গণপরিবহণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও খসড়ায় যুক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু চালকের ভুল বা অসতর্কতাকে দায়ী করে সড়ক দুর্ঘটনার সমাধান সম্ভব নয়। সড়কের নকশা, নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহনের কারিগরি অবস্থা, গতিসীমা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ সব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুসরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যমান সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-তে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের শাস্তির বিধানও রয়েছে। ৯৮ ধারায় বেপরোয়া চালনা, নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং কিংবা অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহনের কারণে জীবন বা সম্পত্তির ক্ষতি হলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। ১০৫ ধারায় বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত চালনায় গুরুতর আহত বা প্রাণহানির ঘটনায় নির্ধারিত শর্তে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনের অন্যতম লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভূমিকা রাখা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুড সামারিটান সুরক্ষা কার্যকর হলে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে সাধারণ মানুষের ভয় ও দ্বিধা কমবে। তবে এ সুরক্ষার অপব্যবহার ঠেকাতে সৎ উদ্দেশ্যে সহায়তার শর্ত, ইচ্ছাকৃত ক্ষতি ও গুরুতর অবহেলার ক্ষেত্রে দায় এবং উদ্ধারকারীর পরিচয় সংগ্রহের প্রক্রিয়া আইনে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে শাস্তির পাশাপাশি নিরাপদ অবকাঠামো, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা এবং মানবিক উদ্ধারকারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলেই কার্যকর সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

