লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা মহামারির সময় দায়িত্ব পালন করা অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য বরাদ্দ ৮ লাখ ৮২ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং প্রধান অফিস সহকারীর যোগসাজশে এই অর্থ উত্তোলন ও আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন ভুক্তভোগী স্বাস্থ্যকর্মীরা। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগ তদন্ত কমিটি গঠন করে কাজ শুরু করেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে করোনা মহামারির সময় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এই অনুদান বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌফিক আহমেদ প্রশাসনিক জটিলতার কথা বলে অর্থ বিতরণ করতে পারেননি। পরবর্তীতে দায়িত্বে আসা ডা. খালেদ হোসেনও বিষয়টি নিষ্পত্তি না করে ঝুলিয়ে রাখেন।
এরপর দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডা. রাজন কুমার দাস। অভিযোগ রয়েছে, তিনি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চাঁদপুরের মতলবে বদলির আগে ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে থাকা প্রধান অফিস সহায়ক (বড়বাবু) মাহবুব আলম লিকুর সঙ্গে যোগসাজশে গোপনে পুরো বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর গত ৯ মার্চ স্বাস্থ্যকর্মী শেফালী বেগমের নেতৃত্বে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গণস্বাক্ষরসহ লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কল রেকর্ডে শেফালী বেগম ও ডা. রাজন কুমার দাসের কথোপকথনে তিনি স্বীকার করেন, উত্তোলিত অর্থের মধ্যে লিকু তাকে ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা দিয়েছেন এবং বাকি অর্থ লিকু নিজের কাছে রেখেছেন। এই অডিও প্রকাশের পর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
ঘটনা প্রকাশের পর চাপের মুখে ডা. রাজন কুমার দাস তার বর্তমান কর্মস্থল চাঁদপুর থেকে ধাপে ধাপে ৪ লাখ টাকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ফেরত দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে বাকি টাকার কোনো হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।
করোনাকালীন সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেও অনুদান না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী স্বাস্থ্যকর্মীরা। তাদের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং বাকি পাওনা টাকা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।
অন্যদিকে অভিযোগ ওঠা প্রধান অফিস সহায়ক মাহবুব আলম লিকুর দপ্তরে সাংবাদিকরা দুই কর্মদিবসে গেলে তিনি অসুস্থতার কথা জানিয়ে ১১ এপ্রিল একদিনের মৌখিক ছুটি নেন বলে জানানো হয়। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই দিনই তিনি জেলা শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় ও অভ্যন্তরীণ সূত্র আরও জানায়, মাহবুব আলম লিকু দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, বেতন হিসাবের বিপরীতে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে পরে অ্যাকাউন্ট পরিবর্তনের মাধ্যমে ঋণখেলাপি হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া অবৈধ অর্থে জেলা শহরের টিঅ্যান্ডটি মোড়ে ছয়তলা একটি ভবন নির্মাণের অভিযোগও উঠেছে। অতীতেও একই কর্মস্থলে দুর্নীতির অভিযোগে তিনি বদলি হয়েছিলেন বলে জানা যায়।
অভিযোগের বিষয়ে মাহবুব আলম লিকু বলেন, “আমি এ ঘটনার বিষয়ে কিছু জানি না। আমি কোনো টাকা আত্মসাৎ করিনি। স্যার কীভাবে টাকা তুলেছেন বা কী করেছেন তা আমি জানি না।” অফিস সহায়ক হয়েও কীভাবে আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন—এ প্রশ্নেরও কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে পারেননি তিনি।
এদিকে অফিসের পিওন এমদাদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “আমি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বড়বাবু লিকুর হাতে দিয়েছি। এরপর টাকার কী হয়েছে আমি জানি না। তবে আমাকে দশ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে সেই টাকা থেকে।”
অভিযোগকারী সিনিয়র স্টাফ নার্স শেফালী বেগম বলেন, “আমরা অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনার সময়ে চিকিৎসা দিয়েছি। আমাদের পাওনা দীর্ঘদিন পাইনি। যারা আত্মসাৎ করেছেন তাদের বিচার চাই এবং আমাদের প্রাপ্য টাকা ফেরত চাই।”
অভিযুক্ত কর্মকর্তা ডা. রাজন কুমার দাস বলেন, “আমি টাকার বিষয়ে কিছুই জানতাম না। লিকু আমাকে বলেছিল এখানে কিছু টাকা আছে, কেউ জানে না। টাকা তুলে কাজে লাগাই। সেখান থেকে ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা আমাকে দিয়েছেন। বাকি টাকা লিকু ভাগাভাগি করে নিয়েছে।”
বর্তমান উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ইফতেখার হোসেন খান জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে ডা. রাজন কুমার দাস চার লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন, তবে বাকি অর্থের হদিস এখনো মেলেনি। সূত্র: জাগো নিউজ

