সকালটি শুরু হয়েছিল একেবারেই স্বাভাবিকভাবে। দুই সন্তানের বাবা মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী প্রতিদিনের মতোই রিকশায় করে কর্মস্থলের দিকে রওনা দেন। পথে হঠাৎ সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি একটি গাড়ি নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। তারা তাকে গাড়িতে ওঠার নির্দেশ দেয়। এরপরই বদলে যায় সেই দিনের চিত্র। সাধারণ সকালটি তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ের সূচনায় পরিণত হয়।
এই ঘটনার বর্ণনা উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে সংঘটিত গুমের অভিযোগে দায়ের করা একাধিক মামলার বিচার চলমান রয়েছে ট্রাইব্যুনালে। এরই অংশ হিসেবে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলা বিচারাধীন। ওই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। তালিকায় সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার নামও রয়েছে।
এই মামলায় গত ১৯ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন মাসরুর আনোয়ার। ৩৬ বছর বয়সী এই সাক্ষী ট্রাইব্যুনালকে জানান, তিনি মূলত সরকারের সমালোচনামূলক লেখালেখি এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করার কারণে লক্ষ্যবস্তু হন। তার অভিযোগ অনুযায়ী, এরপর তাকে দীর্ঘ সময় গুম করে রাখা হয় এবং পরে “জঙ্গি” হিসেবে চিহ্নিত করে কারাগারে পাঠানো হয়।
মাসরুর আনোয়ার বর্তমানে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি তিনি একটি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তিনি ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৯ সালের নভেম্বরে তিনি হোটেল হলিডে ইন-এ পার্ট-টাইম ম্যানেজার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
তিনি আরও জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মাঝেমধ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এবং ভারতের বিষয়ে সমালোচনামূলক লেখা দিতেন। তার ধারণা, এসব লেখালেখিই পরবর্তীতে তার জীবনে বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
|
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে মাসরুর আনোয়ার গুমের সেই ভয়াবহ দিনের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি জানান, রাজধানীর গুলশানের গুদারাঘাট এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন তিনি। প্রতিদিনের মতো ২০২০ সালের ১ মার্চ সকালেও তিনি বাসা থেকে কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হন।
হাতিরঝিল এলাকার পুলিশ প্লাজার পেছনের সেতুর ওপর রিকশা পৌঁছাতেই পেছন থেকে একটি মাইক্রোবাস এসে তার পথ আটকে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ি থেকে সাদা পোশাকধারী পাঁচ-ছয়জন ব্যক্তি নেমে এসে তাকে ঘিরে ধরেন। তারা তার নাম এবং ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে জানতে চান। এরপর তাকে জোর করে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়।
মাসরুরের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রথমে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন এবং তার দুই ছোট সন্তানের কথা জানান। তবে তাকে গুলি করে মেরে ফেলার ভয় দেখানো হয়। বাধ্য হয়ে তিনি গাড়িতে উঠতে রাজি হন। এরপর তাকে পেছনের সিটে বসানো হয়, হাতকড়া পরানো হয় এবং চোখ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।
চলন্ত গাড়িতে তার কাছে আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিষয়ে লেখালেখির কারণ জানতে চাওয়া হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা চলার পর গাড়িটি একটি অজ্ঞাত স্থানে থামে। এরপর তাকে হাঁটিয়ে একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তার হাতকড়া ও চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়।
তিনি জানান, তাকে প্রায় ছয় ফুটের একটি সেলে রাখা হয়, যার ভেতরে ছোট একটি সংযুক্ত টয়লেট ছিল। সেখানে তাকে একটি বনরুটি দেওয়া হলেও মানসিক চাপের কারণে তিনি খেতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর তাকে আবার ডেকে তোলা হয় এবং চোখ বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে আরেকটি কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে একটি চেয়ারে বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়।
মাসরুরের দাবি অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে তাকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লেখালেখি এবং ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণ জানতে চাওয়া হয়। তাকে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে জোরপূর্বক চাপ দেওয়া হয় এবং কোনো উত্তর সন্তোষজনক না হলে শারীরিক নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, ফেসবুকে লেখা ও ব্যক্তিগত মতামতের কথা স্বীকার করলেও তিনি কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নন বলে বারবার জানান। একইসঙ্গে হাতিরঝিলে তার পরিচিত কয়েকজনের বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া হলে তিনি সেসব তথ্য দেন। পরবর্তী সময়ে তাকে আবার সেলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে এক রাত কাটানোর পর পরদিন সকালে তাকে আবার একটি বনরুটি দেওয়া হয় এবং প্রস্তুত হতে বলা হয়। এরপর চোখ বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে তাকে আবার গাড়িতে তোলা হয়।
প্রায় আধা থেকে এক ঘণ্টা চলার পর গাড়ি একটি স্থানে থামে। গাড়ির ভেতর থেকে একজন ফোনে “৩০০ ফিট” এলাকায় অবস্থানের কথা জানিয়ে পরবর্তী নির্দেশনা জানতে চান বলে তিনি শুনতে পান। সেই মুহূর্তে তিনি ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন বলে জানান।
তবে এরপর গাড়িটি আবার চলতে থাকে এবং কিছু সময় পর একটি স্থানে পৌঁছে থামে। সেখানে “র্যাব” লেখা একটি সাইনবোর্ড দেখতে পান তিনি। পরে তাকে একটি টিনশেড ভবনের দোতলায় নেওয়া হয় এবং সেখানে আবার একটি কক্ষে বসানো হয়। মাসরুরের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে তার চোখের বাঁধন ও হাতকড়া খুলে দেওয়া হলেও তাকে মাথা নিচু করে বসে থাকতে বাধ্য করা হয়। মাথা তুললেই লাঠি দিয়ে আঘাত করে নিচু করে রাখা হতো বলেও তিনি ট্রাইব্যুনালে জানান।
মাসরুর বলেন, দুপুরে তাকে পান্তাভাত খেতে দেওয়া হলে তিনি শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক চাপের কারণে তা বমি করে ফেলেন। এরপর তাকে করিডোর দিয়ে হাঁটিয়ে আরেকটি সেলে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে একটি টি-শার্ট ও লুঙ্গি দেওয়া হয়। তবে কিছুক্ষণ পরই আবার তার চোখ ও হাত বেঁধে ফেলা হয় এবং শুয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়। সেই অবস্থায় তিনি সন্তান ও পরিবারের কথা ভেবে সময় পার করেন বলে জানান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, চোখের বাঁধনের ফাঁক দিয়ে পাশের সেলের কয়েকজনের সঙ্গে ইশারায় যোগাযোগের সুযোগ পান তিনি। তাদের মধ্যে একজন তারেক সাইফুল, বয়স আনুমানিক ১৬–১৭ বছর, বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া। তিনি জানান, ওই কিশোরসহ অন্যরা এক থেকে তিন বছর ধরে আটক আছেন এবং পরিবারের কেউ তাদের খোঁজ জানেন না। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেককে এর আগেও হত্যা করা হয়েছে বলে তারা শুনেছেন।
কয়েক ঘণ্টা পর মাসরুরকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে নেওয়া হয়। তার চোখ তখনও বাঁধা ছিল। তবে কথাবার্তা শুনে তিনি ধারণা করেন সেখানে পাঁচ-ছয়জন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগবিরোধী ও ভারতবিরোধী অবস্থান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ এবং বিভিন্ন জঙ্গি হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে প্রশ্ন করা হয়।
মাসরুর জানান, তিনি পুলিশ ভেরিফিকেশন ও কর্মস্থলের যাচাইয়ের বিষয়টি তুলে ধরলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। বরং তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা চলে। তাকে বলা হয়, যা স্বীকার করতে বলা হচ্ছে তা স্বীকার না করলে পরিণতি ভোগ করতে হবে।
তার অভিযোগ অনুযায়ী, জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করাতে চাপ দেওয়া হয়। তিনি অস্বীকার করলে তাকে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো স্বীকারোক্তি না পেয়ে তাকে আবার সেলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
সেলে ফেরার পর তার ওপর কড়াকড়ি নজরদারি চলত বলে তিনি জানান। চোখ বাঁধা ও হাতকড়া প্রায় সারাক্ষণই থাকত। নির্দিষ্ট সংকেত না দিলে বাথরুমেও যেতে দেওয়া হতো না এবং নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলে মারধর করা হতো। এমনকি খাবারের পর হাত ধোয়া পানি পান করাতেও বাধ্য করা হতো বলে দাবি করেন তিনি। এই পরিস্থিতি কয়েকদিন ধরে চলতে থাকে।
এক পর্যায়ে একজন গার্ড তাকে ফিসফিস করে বলেন, “তুই বেঁচে গেছিস, নফল নামাজ পড়ে নে।” এরপর তাকে পোশাক পরিবর্তন করতে বলা হয় এবং কিছু সময় পর আবার গাড়িতে তুলে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে পুনরায় আগের সেলে ফিরিয়ে আনা হয়।
সেখানে ফিরে তিনি দেখতে পান, যাদের নাম ও নম্বর তিনি আগেই দিয়েছিলেন, তাদেরও সেখানে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে ছিলেন কাওসার আলম ফরহাদ, আসিফ ইফতেহাজ রিবাত এবং রাকিব নামে আরেকজন। মাসরুর জানান, ফরহাদ ও রিবাত চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে ঢাকায় চাকরি করতেন। তাদের মধ্যে কেউ বাসা থেকে, কেউ আবার রাস্তা থেকে তুলে আনা হয়েছে বলে জানা যায়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে আরও কয়েকজনকে একই প্রক্রিয়ায় আনা হয়। রাতের দিকে তাদের একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয় এবং কিছু সময় পর সেখানে আরও কয়েকজনকে যুক্ত করা হয়। এরপর আবার সেলে ফিরিয়ে আনা হয় তাদের।
মাসরুরের দাবি, এসব ঘটনার মাধ্যমে পরবর্তীতে একটি মামলায় তাদের জড়ানোর জন্য পরিকল্পিত পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছিল। পরদিন তাদের গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হয় এবং ছবি তোলা হয়। এরপর একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয় এবং সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় সোপর্দ করে জঙ্গি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় বলে তিনি জানান। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
তিনি আরও জানান, র্যাব-১১ এর তৎকালীন কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিনের নেতৃত্বে তাকে অপহরণ ও গুম করা হয়েছিল বলে পরবর্তীতে জানতে পারেন। প্রথমে তাকে র্যাব-১১ এর একটি সেলে রাখা হয়, পরে টিএফআই সেলে স্থানান্তর করা হয়। প্রায় ১০ মাস কারাগারে থাকার পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে পুরো সময় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী বলেন, তদন্তে একাধিক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে জানা গেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে গুমের পর তাদের জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সাজানো নাটকের মাধ্যমে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গুম কমিশনের প্রতিবেদনে এসব বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

