ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন নূরজাহান আক্তার। সেই সময় থেকেই তিনি গড়ে তোলেন বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যের কৌশল। ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে তিনি এই খাতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধান ও অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে তিনি তার স্বামী আব্দুস সাত্তারের নামে “এসএএম ইন্টারন্যাশনাল” (আরএল-১২০৩) নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সি চালু করেন। পরবর্তীতে নিজের নামে “টি-২০ ওভারসিজ” (আরএল: ১৪১৫) নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
এরপর তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ ওঠে, তিনি নিজের কর্মচারী, ভাই এবং নিকট আত্মীয়দের নামে একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সি পরিচালনা করেছেন। পাশাপাশি টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন এজেন্সিকে অনুমোদন পাইয়ে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। লিবিয়ায় ২৬ জন বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আটক করেছিল। তবে পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। মুক্তির পর তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া, বিএমইটির (জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) বহির্গমন শাখায় তার প্রবেশ নিষেধ থাকা সত্ত্বেও সেখানে তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল বলে জানা গেছে। অফিস সময় শেষে ওই জায়গাতেই তিনি অনিয়মের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক পাঠানোর অনুমোদন তিনি নেন। তবে যে কোম্পানির ডিমান্ড লেটারের ভিত্তিতে এই অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, অনুসন্ধানে সেই কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে কম্বোডিয়া হয়ে ইউরোপে মানব পাচারের একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
এসব অভিযোগের মাধ্যমে তিনি বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। তবুও তিনি প্রভাবশালী অবস্থান ব্যবহার করে এখনও বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই নারীর সঙ্গে মেক্সিকোর কুখ্যাত ড্রাগ কার্টেল নেটওয়ার্কের প্রভাবশালী নারী সান্দ্রা আভিলা বেলত্রানের সঙ্গে তার কর্মকাণ্ডের মিল খোঁজার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ।
সান্দ্রা আভিলা বেলত্রান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ‘কুইন অব প্যাসিফিক’ নামে পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সমুদ্রপথে গড়ে ওঠা মাদক সিন্ডিকেট, অর্থ পাচার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র নিয়ন্ত্রণ করতেন। ২০০৭ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। পরে ২০১৫ সালে তিনি জামিনে মুক্তি পান এবং ব্যক্তিজীবনে পরিবর্তন আনেন বলে জানা যায়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নূরজাহান আক্তারের কর্মকাণ্ডকে কেউ কেউ তুলনা করছেন, তবে এটি মূলত অভিযোগ ও বিশ্লেষণভিত্তিক মন্তব্য।
অভিযোগ রয়েছে, জামিনে মুক্তির পর নূরজাহান আক্তার আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং রিক্রুটিং এজেন্সি ও বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, নূরজাহান আক্তার ও তার স্বামী আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। একটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দেওয়া হয়েছে। কমিশন গঠিত হলে তা অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে।
তদন্ত প্রতিবেদনে দুদক কর্মকর্তারা নূরজাহান আক্তারের বিরুদ্ধে সাড়ে ৩ কোটি টাকারও বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া লিবিয়ায় ২৬ জন বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় পল্টন থানায় দায়ের করা মামলার চার্জশিটে নূরজাহান আক্তার ও তার স্বামী আব্দুস সাত্তারকে অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের বড় ভূমিকা থাকায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। একসময় এই প্রতিষ্ঠানে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন নূরজাহান আক্তার। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, লিবিয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর তিনি ওই চাকরি হারান। এরপর থেকেই তিনি পুরোপুরি রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব খাটিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এর মধ্যে রয়েছে—নিজের নামে টি-২০ ওভারসিজ (আরএল: ১৪১৫), স্বামী আব্দুস সাত্তারের নামে এসএএম ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ১২০৩), ভাইয়ের নামে সুফিয়ানা ট্রেড লিংক (আরএল: ১৬০১) এবং কর্মচারীর নামে মেসার্স নাহিন ইন্টারন্যাশনাল।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) ওয়েবসাইটে থাকা একটি ফোন নম্বরও তার নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়েছে। পাশাপাশি আরও কিছু লাইসেন্স অনুমোদনে মধ্যস্থতা বা ব্রোকারি করার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে। বর্তমানে মেসার্স নাহিন ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকে প্রায় তিন হাজার কর্মী পাঠানোর চেষ্টা চলছে বলেও জানা গেছে। সব মিলিয়ে রিক্রুটিং খাতকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্ক নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান শাখা থেকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি একটি চিঠির মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সি মেসার্স নাহিন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (আরএল-২৫৫০) ইরাকগামী তিন হাজার কর্মী OEP-তে অন্তর্ভুক্তির অনুমতি দেওয়া হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার ইরাকে পুনরায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে তিন হাজার কর্মী OEP-তে অন্তর্ভুক্তির অনুমতি প্রদান করা হলো। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই অনুমোদনের বিপরীতে জমা দেওয়া একাধিক ডিমান্ড লেটারে উল্লেখিত বিদেশি কোম্পানিগুলোর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১৩ নভেম্বর ইস্যু করা একটি ডিমান্ড লেটারে ইরাকভিত্তিক “বারেক আলনুর কোম্পানি (Bareeq Al Noor Company)” নাম উল্লেখ করে ৪০০ জন ক্লিনার কর্মী (পুরুষ) নিয়োগের কথা বলা হয়। তাদের মাসিক বেতন হিসেবে ৩৫০ ডলার উল্লেখ করা হয়েছে। একই নথিতে আরও ১০ জন কর্মীর জন্য একই বেতনের কথা উল্লেখ রয়েছে।
অন্য একটি ডিমান্ড লেটারে “আল-আবরার কোম্পানি” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে ৬০০ জন শ্রমিকের চাহিদা দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে ৫৮৫ জন পুরুষ ও ১৫ জন নারী। এখানে ক্লিনার পদের জন্য মাসিক বেতন হিসেবে ৩৫০ টাকার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা নিয়ে অসংগতি তৈরি হয়েছে। নথিতে এই প্রতিষ্ঠানকে বারেক আল নূর কোম্পানির সিস্টার কনসার্ন হিসেবেও দেখানো হয়েছে।
তবে অনলাইন অনুসন্ধানে ইরাকে এই নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। যদিও “Bereket Al Noor” নামে একটি কোম্পানির তথ্য পাওয়া গেছে, যা মূলত সোলার খাতের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এছাড়া “BAREEQ AL NOOR TYPING” নামের একটি টিকটক আইডিও পাওয়া গেছে, যেখানে বিদেশে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে বিভিন্ন প্রচারণামূলক ভিডিও এবং সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয় বলে জানা যায়।
আরও একটি ডিমান্ড লেটারে “সিগাল কোম্পানি জেনারেল ট্রেডিং লিমিটেড (Seagull Company General Trading Limited)” নামের প্রতিষ্ঠান থেকে এক হাজার কর্মীর চাহিদা দেখানো হয়েছে। দুই বছরের চুক্তিতে মাসিক বেতন ৩৫০ ডলার উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইরাকের সরকারি সূত্রে এই কোম্পানির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যদিও কুয়েতভিত্তিক একই নামের একটি রিয়েল এস্টেট ও কনট্রাকটিং কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, টি-২০ ওভারসিজের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্যও অনুসন্ধানকারীদের হাতে এসেছে। অন্যদিকে বিএমইটির বহির্গমন শাখায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নূরজাহান আক্তারের সেখানে নিয়মিত যাতায়াতের একাধিক ভিডিওচিত্র পাওয়ার দাবি করেছে অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, কম্বোডিয়া ও ইরাকে অতীতেও বহু মানুষ গিয়ে কাজ না পেয়ে বিভিন্ন ধরনের শোষণ ও দাসত্বের শিকার হয়েছেন। এ বিষয়ে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নূরজাহান আক্তারের বিষয়ে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এ প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিএমইটির নতুন মহাপরিচালক এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নেবেন এবং প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়েরও উচিত এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা, কারণ এসব চক্রের কারণে বহু মানুষ প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. তানজির আহমেদ জানান, নূরজাহান আক্তার ও তার স্বামী আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার তদন্ত চলছে। পাশাপাশি আরও কিছু অভিযোগের অনুসন্ধানও চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, তদন্ত ও অনুসন্ধান কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাদিক মাহমুদ বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে কাজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী অদৃশ্য সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। সেই সিন্ডিকেটের প্রভাবেই দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে মনে হয়।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু দুদক ইতোমধ্যে অনুসন্ধান শেষে মামলা করেছে, তাই আইনগতভাবে তাকে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায়। দেশের নাগরিকদের স্বার্থে এসব মামলার ভিত্তিতে তার রিক্রুটিং লাইসেন্স দ্রুত বাতিল এবং সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা উচিত।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, নূরজাহান আক্তার ও তার স্বামী আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে দুদকে একাধিক মামলা ও অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং চার্জশিট অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। দুদকের অনুসন্ধানে এ দম্পতির একাধিক ব্যাংক হিসাব ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি কালবেলার অনুসন্ধানে তাদের বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য-প্রমাণও উঠে এসেছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাট ক্রয়ের মাধ্যমে তারা উল্লেখযোগ্য সম্পদ গড়ে তুলেছেন। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে ঢাকার খিলগাঁও এলাকার সিদ্ধেশ্বরী মৌজায় অবস্থিত ‘কসমোপলিটন হালিম নিবাস’-এর অষ্টম তলার একটি ফ্ল্যাট। কার পার্কিংসহ এই ফ্ল্যাটের দলিলে মূল্য দেখানো হয়েছে ৪১ লাখ টাকা, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে এর বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা।
ঢাকার খিলগাঁও থানার অন্তর্গত গোড়ান মৌজায় সিটি জরিপ দাগ নং-১১৫৮-এ আড়াই কাঠা জমি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এটি ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের বনশ্রী নিউটাউন প্রকল্পের ‘দক্ষিণ বনশ্রী (গোড়ান)’ এলাকায় অবস্থিত। দলিল অনুযায়ী, নূরজাহান আক্তার ও তার স্বামী আব্দুস সাত্তার যৌথভাবে এই জমি ক্রয় করেন, যেখানে ২ দশমিক ৫০ কাঠা জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ৪৪ লাখ টাকা। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বাজারদরে এই জমির মূল্য ২ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
একইভাবে উত্তর মেরাদিয়া (বর্তমান আফতাবনগর প্রকল্প এলাকা) মৌজায় একাধিক জমি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এখানে ৫ কাঠা জমির একটি প্লট (প্লট নং-এফ/০২, রোড নং-০১, অ্যাভিনিউ-৮, সেক্টর-১) ছয়জনের যৌথ মালিকানায় কেনা হয়। এর মধ্যে নূরজাহান আক্তারের অংশ ২০৬ দশমিক ২৫ অযুতাংশ। এ অংশের দলিলমূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ১৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। একই এলাকায় আরও একটি ছোট অংশের জমি (৮২ অযুতাংশ) ক্রয়ের তথ্য রয়েছে, যেখানে তার অংশ ১৩ দশমিক ৬৬ অযুতাংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাস্তব বাজারমূল্যে এসব জমির দাম কোটি টাকার বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে।
পল্টন থানার দক্ষিণ শহর খিলগাঁও মৌজায় একটি বহুতল ভবনের পঞ্চম তলায় ১২৭০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে। দলিলে এর মূল্য দেখানো হয়েছে ৩২ লাখ টাকা। ফ্ল্যাটটির অর্ধেক মালিকানা নূরজাহান আক্তারের নামে এবং বাকি অর্ধেক তার ভাই আব্দুর রহমানের স্ত্রী শাম্মি আক্তারের নামে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এর বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা।
ঢাকার বাইরে সাভারের আশুলিয়া এলাকায়ও একাধিক জমি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সাবকবলা দলিল নম্বর ৯৬২০, তারিখ ২০-৬-১৭ অনুযায়ী ০৮২৫ অযুতাংশ জমির রেজিস্ট্রেশন ফি দেখানো হয়েছে ৫৬ লাখ টাকা। একই এলাকায় আরেকটি দলিল (নম্বর ১০৯০১) অনুযায়ী ৫ শতাংশ জমি নূরজাহান আক্তার ও তার বোন তাহমিনা আক্তারের নামে কেনা হয়, যার দলিলমূল্য দেখানো হয়েছে ৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
ধামসোনা ইউনিয়নের পলাশবাড়ি ও বাঁশবাড়ি মৌজায়ও একাধিক জমি ও নির্মাণ কাজের তথ্য রয়েছে। সেখানে কয়েকটি দাগে জমির ওপর পাঁচতলা ভবন নির্মাণে প্রায় ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। জমি ও নির্মাণসহ মোট বিনিয়োগ প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বেশি বলে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দক্ষিণ বাঙ্গরা মৌজায় নাল জমি ক্রয়, ঢাকার পলাশবাড়ি মৌজায় আরএস দাগ নং-৩০৪-এ ৩ শতাংশ জমি (মূল্য ২২ লাখ টাকা) এবং সিদ্ধেশরী এলাকায় ফ্ল্যাটের অংশ দানসূত্রে প্রাপ্তির তথ্যও পাওয়া গেছে। মিরপুর থানার সেনপাড়া পর্বতা মৌজার সিটি জরিপ দাগ নং ৫১০৮০-এ ৬৬ অযুতাংশ জমি ১১ লাখ টাকায় দলিলভুক্ত করার তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব সম্পত্তির একটি অংশ আত্মীয়স্বজনের নামে রাখা হয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে, যা বেনামি সম্পদ গঠনের ইঙ্গিত দিতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দলিলমূল্য বাস্তব বাজারদরের তুলনায় অনেক কম দেখানো হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এ ছাড়া নূরজাহান আক্তারের স্বামী আব্দুস সাত্তারের নামেও বিপুল সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে ১৮৯৫ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, যা দেড় শতাংশ জমির ওপর নির্মিত। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য দেড় কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া পলাশবাড়ি মৌজায় ৩ শতাংশের একটি প্লট, সাভারের বাঁশবাড়ি মৌজায় ৫ শতাংশ জমি, গোড়ান এলাকায় আড়াই কাঠার একটি প্লট (সিটি জরিপ দাগ নং ১১৫৮) এবং কুমিল্লার মুরাদনগরে বিএস দাগ নং ২০৯৭-এ ৫ দশমিক ১৬৫ অযুতাংশ জমির তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, এ দম্পতির নামে বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ওয়ান ব্যাংকের বনশ্রী শাখায় প্রায় ৩০ লাখ টাকা, উত্তরা ব্যাংকের লেডিস ব্রাঞ্চে সাড়ে ৪ লাখ টাকা, শান্তিনগর শাখায় ৯ লাখ টাকা এবং একই ব্যাংকের আরেক শাখায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া ব্র্যাক ব্যাংক শান্তিনগর শাখায় ২৫ লাখ টাকা ও আরও একটি এফডিআরে ২০ লাখ টাকা জমা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, এবি ব্যাংক ও এসআইবিএলসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকে তাদের নামে ডিপোজিট ও নগদ অর্থ থাকার তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নূরজাহান আক্তার একাধিক প্রশ্নের জবাবে উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া দেখান। তিনি দাবি করেন, ইরাকে তিন হাজার কর্মী পাঠানোর অনুমোদন পাওয়া রিক্রুটিং এজেন্সি “মেসার্স নাহিন ইন্টারন্যাশনাল” তার কর্মচারীর নামে হলেও তিনি বর্তমানে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত নন।
ডিমান্ড লেটার ভুয়া নয় এবং কোম্পানির অস্তিত্ব রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব বিএমইটি ও মন্ত্রণালয়ের। কারও ব্যক্তিগত অভিযোগ দিয়ে কিছু প্রমাণ হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দুদকের মামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং সাংবাদিকতার বিষয়ে কঠোর মন্তব্য করেন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে তিনি প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেন এবং একটি গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সব অভিযোগ, নথিপত্র, তদন্ত আর পাল্টা বক্তব্যের ভিড়ে একটি প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে জোরে বাজে—এই পুরো ব্যবস্থায় কারা আসলে দেখছে, আর কারা চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে? বিদেশে কাজের স্বপ্ন নিয়ে বের হওয়া মানুষগুলো যখন প্রতারণা, অনিশ্চয়তা আর ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ে, তখন প্রশ্নটা আর শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা হয়ে ওঠে পুরো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, নজরদারি আর জবাবদিহির প্রশ্ন।
অনুসন্ধান শেষ হয়, প্রতিবেদন প্রকাশ পায়, আলোচনা হয়—কিন্তু ভেতরের কাঠামো কি সত্যিই বদলায়, নাকি একই গল্প শুধু নাম বদলে আবার ফিরে আসে?
এই গল্প শুধু একজনের নয়—এটা এমন একটি ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি, যেখানে সত্য আর প্রভাবের লড়াই অনেক সময় একই টেবিলে বসেও সমানভাবে শোনা যায় না। আর ঠিক সেখানেই শেষ লাইনটা অনুচ্চারিত থেকে যায়—সব দেখা গেলেও, আসলে কতটা দেখা হচ্ছে? সূত্র: কালবেলা
সিভি/এম

