আগামী অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। মানসম্মত শিক্ষা ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই দুই খাতে ব্যয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্কুলবাস ও অ্যাম্বুলেন্স আমদানিতে রাজস্ব ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্তও বাজেটে থাকতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটে কর্মসংস্থান বাড়াতে এলাকাভিত্তিক বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সরকারি কলকারখানা পুনরায় চালুর বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং পুঁজিবাজারে বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনাও রয়েছে। খাল খনন ও সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আগামী জুনে প্রথম বাজেট দিতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। এই বাজেটে দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সরকারের আয় বাড়াতে গ্রামীণ কুটির শিল্প, কারিগরি ও সৃজনশীল শিল্পকে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং স্টার্টআপ খাতেও বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ক্রীড়া, সংস্কৃতি, নাটক, সিনেমা ও সংগীতকে নতুন অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হবে। উপজেলা পর্যায়ের সম্পদশালীদের করজালে আনার জন্য রাজস্ব দপ্তরের কার্যক্রমও বাড়ানো হবে।
শিক্ষা খাতে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা:
সূত্র জানায়, আগামী বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হতে পারে। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। নারীদের স্নাতক (অনার্স) পর্যন্ত শিক্ষা বিনামূল্যে করার পরিকল্পনা রয়েছে। মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির পরিধিও বাড়ানো হবে।
১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি উদ্যোগে স্কুলব্যাগ, ইউনিফর্ম ও জুতা সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা চালু এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর কথাও বাজেটে থাকতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতেও জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য কার্ড চালু এবং সচেতনতা বাড়াতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব থাকবে। গ্রামাঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও নার্স সংকট নিরসনে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হবে। আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, সেবার মান উন্নয়ন এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা দূর করার বিষয়গুলোও বাজেটে গুরুত্ব পাবে।
এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকগুলোতে নির্বাচনি অঙ্গীকারগুলোর বড় অংশ আসন্ন বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকার বাজেটের মাধ্যমে নীতিগত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের স্পষ্ট বার্তা দিতে চায়।
নির্বাচনি অঙ্গীকারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড চালু অন্যতম। এটি বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত ১২ হাজার কোটি থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। এছাড়া ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের বিষয়ও অঙ্গীকারে রয়েছে।
রাজস্ব লক্ষ্য ও অর্থনৈতিক সংস্কার:
আগামী অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে। এ লক্ষ্য পূরণে এনবিআরকে প্রায় ৫০ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ব্যয় বাড়াতে গেলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাজস্ব আদায় বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, করের আওতা বৃদ্ধি, এনবিআরের আধুনিকায়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব অর্জন সম্ভব নয়। বাস্তবতা বিবেচনায় সতর্ক বাজেট প্রণয়নের পরামর্শ দেন তিনি। অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতায় বড় ব্যয়ভিত্তিক বাজেট ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই ব্যয়ে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
সূত্র অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৯.৪ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) হতে পারে ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি ধরা হতে পারে ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। দেশের মোট জিডিপির আকার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৮ লাখ ৭০৭ কোটি টাকা।
আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করে বড় বরাদ্দের পরিকল্পনা থাকলেও একই সঙ্গে রাজস্ব বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কাঠামোগত সংস্কারের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

