বহুল আলোচিত প্রশাসনিক সংস্কার প্রস্তাব এখন কার্যত ফাইলবন্দি। স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব প্রশাসন গঠনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছে। ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ার উদ্যোগও দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রশাসন বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক শীর্ষ আমলাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র উঠে এসেছে। তাদের মতে, আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো এখন আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে গেছে। কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব ও দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্য জমা দেওয়ার বিষয়টিও কার্যকর অবস্থায় নেই।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সরকার পরিবর্তন হলেও প্রশাসনের আচরণগত সংস্কৃতি খুব একটা বদলায় না। আগে যে ‘লালফিতার দৌরাত্ম্য’ ছিল, এখন তা ভিন্ন রূপে টিকে আছে। ফাইল আটকে ঘুস আদায়, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, দুর্নীতি ও অনিয়ম এখনও প্রশাসনের বড় অভিযোগ হিসেবে রয়ে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলেও তাদের ধারণা।
সাবেক কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী প্রশাসনের একটি অংশ এখনও প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে। তাদের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং আগের সরকারের সময়কার কর্মকর্তাদের বড় অংশ নিজ নিজ অবস্থানে বহাল থাকায় জনবান্ধব প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়ে।
এসব কর্মকর্তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির শুরুর সময় দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, সেখানে প্রশাসনের পূর্ণ সহযোগিতা সরকার পায়নি। বড় কয়েকটি নীতিগত বিষয়েও প্রশাসনের ভেতরে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, প্রশাসনকে আরও জনমুখী ও জবাবদিহিমূলক করতে সংস্কার কার্যক্রম চালু রয়েছে। আইনি কাঠামোর মধ্য থেকেই আমলাতন্ত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তারা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। তাদের অভিযোগ, ঘুস ও অনিয়মের ধরনে কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফাইল অগ্রসর করাতে এখনও বাড়তি অর্থ দিতে হয়। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করাও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত ২০ দিনে দেশের আট বিভাগের শতাধিক সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে একই ধরনের অভিযোগ। ভূমি অফিস, বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিসসহ সাধারণ মানুষের সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে অনিয়ম ও ঘুসের প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়েছে বলে দাবি করেছেন তারা। বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন না এলে সেই প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন আশঙ্কাই এখন বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
মুয়ীদ কমিশনের সুপারিশ এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়:
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক সংস্কারের বড় উদ্যোগ হিসেবে গঠন করা হয়েছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিশন। অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ আমলা আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন সেই কমিশনের লক্ষ্য ছিল পুরোনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে একটি দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বহু আলোচিত সেই সুপারিশমালা এখনো কার্যকর উদ্যোগের মুখ দেখেনি।
কমিশনের প্রতিবেদনে প্রশাসনের ঔপনিবেশিক ও সামন্তবাদী মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার ওপর জোর দেওয়া হয়। সেখানে দুর্নীতিমুক্ত, আইনমুখী এবং দেশপ্রেমিক প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের জন্য একাধিক সুপারিশ করা হয়েছিল। নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ ছিল প্রতিবেদনে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় আনুগত্যের বাইরে থেকে মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কমিশন পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা বাতিলের সুপারিশও করে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগীয় সার্ভিস কমিশনের আদলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের জন্য আলাদা কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এতসব গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ এখনো বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি। ফলে প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে হতাশায় রূপ নিচ্ছে।
এ বিষয়ে গবেষক ও জনপ্রশাসনবিষয়ক লেখক মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো এখনো প্রকৃত অর্থে জনবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে আনা হয়েছিল এবং সেটিকে ব্যবহার করা হয়েছে দুর্নীতি ও দুঃশাসনের হাতিয়ার হিসেবে।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনকে সেই রাজনৈতিক ধারা থেকে বের করে আনতে পারেনি। ফলে আগের কাঠামো ও সংস্কৃতির বড় অংশ এখনো বহাল রয়েছে। প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে জনগণের সেবায় নিয়োজিত না করতে পারলে দেশে কার্যকর সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঔপনিবেশিক মানসিকতার ছাপ এখনো প্রশাসনে:
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অভিযোগ আলোচনায় রয়েছে—এখনো এর ভেতরে ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রভাব রয়ে গেছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিটিশ শাসনামলে যে আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণের সেবা নয়; বরং শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। সেই সংস্কৃতির অনেক অংশ এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দৃশ্যমান।
তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে প্রশাসনিক কাঠামোকে সুসংগঠিত করতে একের পর এক কমিশন গঠন করা হয়। ১৮৮৬ সালে হিচমিন কমিশন, ১৯১২ সালে ইসলিংটন কমিশন, ১৯২৪ সালে লি কমিশন এবং ১৯৩০ সালে সাইমন কমিশনের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই সময় প্রশাসনের ভেতরে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে ওঠে যেখানে সাধারণ মানুষকে ‘প্রজা’ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। কর্মকর্তাদের মধ্যে সামন্তবাদী মনোভাবের শেকড়ও তখন থেকেই গভীর হতে শুরু করে। তাদের ভাষ্য, ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগের পর পাকিস্তান আমলেও একই প্রশাসনিক ধারা বহাল ছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসেও সেই কাঠামো ও মানসিকতার বড় পরিবর্তন ঘটেনি।
একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রে প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭১ সালে গঠন করা হয় ‘সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেস্টোরেশন কমিটি’। পরে ১৯৭২ সালে ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিঅর্গানাইজেশন কমিটি’ ও ‘ন্যাশনাল পে স্কেল কমিশন’ গঠন করা হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় পুনর্গঠন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং নতুন বেতন কাঠামো চালুর কাজ শুরু হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় ‘পে অ্যান্ড সার্ভিস কমিশন’ গঠন করে প্রশাসনের পুনর্গঠন ও বেতন কাঠামোর সংস্কার করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক সংস্কার ও পুনর্গঠন কমিটি, জাতীয় বেতন কমিশন, প্রশাসন সংস্কার কমিশন এবং জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ ছাড়া ২০০৫ সালে ‘ট্যাক্স ওমবাডসম্যান আইন’ প্রণয়ন এবং ২০০৭ সালে ‘রেগুলেটরি রিফর্ম কমিশন’ গঠনের মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারও বাস্তবায়ন করা হয়। তবে এত উদ্যোগের পরও প্রশাসন পুরোপুরি জনবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি উপজেলা পর্যায়ের সরকারি দপ্তরে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ এখনো অনেক ক্ষেত্রে ভীতিকর ও কর্তৃত্ববাদী আচরণের মুখোমুখি হচ্ছেন। ছোট পদমর্যাদার কর্মচারীকেও ‘স্যার’ সম্বোধন না করলে সেবা পেতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন ভূমির মালিকের অভিজ্ঞতায় জানা যায়, তহসিলদারকে ‘স্যার’ না বলায় তার সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। পরে দীর্ঘ দুই বছর তিনি জমির খাজনা দিতে পারেননি। একইভাবে স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদেরও সহকারী কমিশনার বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ না বলায় হেনস্তার অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘স্যার’ না বলার জেরে কয়েকজন সাংবাদিককে কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিশিষ্ট নাগরিকদের মতে, এসব ঘটনা প্রশাসনের ভেতরে রয়ে যাওয়া সামন্তবাদী ও ঔপনিবেশিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
দুর্নীতি ও দখলবাণিজ্যের ছায়ায় প্রশাসন:
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রশাসন ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে চলে যায়—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই সময়ে আমলাতন্ত্রকে দলীয় কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা হয়, যার প্রভাব এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রশাসনের রাজনীতিকরণের প্রবণতা নতুন নয়। তারা উল্লেখ করেন, ১৯৭৫ সালে বাকশাল আমলেও সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তাদের দাবি, পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা সরকারের আমলেও প্রশাসন পরিচালনায় একই ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি প্রকাশিত শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়েছে, গত ১৫ বছরে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। সেখানে গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচারের তথ্য উল্লেখ করা হয়। সেই হিসাবে মোট পাচারের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবেদনে এসব দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের সঙ্গে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে এসেছে।
বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা এক জ্যেষ্ঠ সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবের আওতায় আনার ক্ষেত্রে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তার ভাষ্য, প্রশাসনের নীতিনির্ধারণে সরকারি বিধি-বিধানের চেয়ে রাজনৈতিক নির্দেশনা বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এর ফলে অনেক মেধাবী কর্মকর্তা ওএসডি, বদলি বা প্রশাসনিক শাস্তির মুখে পড়েন বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও প্রশাসনের ভেতরে আগের প্রভাব বজায় ছিল বলে অভিযোগ তোলেন সাবেক সচিব ও বর্তমান জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ। তিনি এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্তসহ একটি লিখিত অভিযোগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। বিষয়টি নিয়ে সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা অভিযোগগুলোর অনেকাংশকে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ পর্যায়ে কয়েকজন উপদেষ্টাও প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানান। উপদেষ্টা ও সাবেক আমলা ফাওজুল কবির খান বিদায়ের আগে প্রশাসনের জটিলতা ও অকার্যকারিতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তার মতে, প্রশাসন এমন এক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে যেখানে মানবিক দায়বদ্ধতা ও জনসেবার মানসিকতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক না করতে পারলে কাঙ্ক্ষিত সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, প্রশাসনিক সংস্কৃতিরও মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
সরকার বদলালেও বদলায়নি আমলাতন্ত্রের চরিত্র:
দেশের সাম্প্রতিক জ্বালানি তেল সংকট ঘিরে আবারও প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। সংকট মোকাবিলায় সমন্বয়হীনতা ও কিছু কর্মকর্তার অসহযোগিতামূলক আচরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তাদের দাবি, প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সুবিধাভোগী সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি ভাঙা যায়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির পর দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশায় পাম্প মালিক, মজুতদার এবং সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। তার অভিযোগ, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে পুঁজি করে মুনাফা ও দুর্নীতির সুযোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দুর্নীতিবাজ ও মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রে আপসের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু ব্যক্তি দেশ ছাড়লেও প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতিনির্ভর সংস্কৃতি পুরোপুরি দূর হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। একই সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কতজনের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য জানতে পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন বিভাগে চিঠি পাঠায়।
তবে এই দুই উদ্যোগের পর প্রশাসনের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হয় বলে জানা গেছে। সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন শুরু হয় নানা দাবিতে। একপর্যায়ে সম্পদের হিসাব জমা দেওয়া এবং দ্বৈত নাগরিকত্ব যাচাইয়ের বিষয়টি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার যে বার্তা দিয়ে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তা আর অগ্রসর হয়নি।
অন্যদিকে সরকার বলছে, দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলতেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী বলেন, সরকার চায় প্রশাসন সততা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করুক। তার মতে, প্রশাসন শক্তিশালী ও কার্যকর হলে এর সুফল সাধারণ মানুষই পাবে।
তিনি জানান, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ইশতেহারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রশাসনের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য পদোন্নতি, পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে যোগ্যতা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করছে এবং এ জন্য প্রশাসনের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন; তাদের দায়িত্ব দেশের স্বার্থে কাজ করা।
তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, নীতিগত বক্তব্যের বাইরে বাস্তবে প্রশাসনের সংস্কৃতি কতটা বদলানো সম্ভব হবে, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সূত্র: Bd Today

