বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বিরল ও সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী পাচারের একটি আন্তর্জাতিক চক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া গেছে। তদন্তে দেখা গেছে, রাজধানীর মিরপুরে একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা ৪২টি বন্যপ্রাণী এই চক্রেরই অংশ। এতে স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশ এখন শুধু উৎস দেশ নয়; বরং আন্তর্জাতিক পাচারের গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কাঁটাবনের একটি পোষা প্রাণীর দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করার সময় থেকেই চক্রটির সঙ্গে যুক্ত হন হাদিস রহমান নামের এক ব্যক্তি। পরে তিনি মিরপুরে নিজের দোকান খুলে আড়ালে গড়ে তোলেন এই পাচার চক্র। স্থানীয় পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে বিরল প্রাণী সংগ্রহ করে ঢাকায় এনে মজুত করা হতো এবং পরে বিমানবন্দর ও সীমান্তপথ ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাচার করা হতো।
তদন্তে আরও জানা গেছে, এই চক্র এক দশকের বেশি সময় ধরে সক্রিয়। তাদের নেটওয়ার্ক শুধু বাংলাদেশের প্রাণী নয়, বিভিন্ন দেশ থেকে আনা বন্যপ্রাণীকেও বাংলাদেশ হয়ে অন্য দেশে পাচারের জন্য ব্যবহার করত। ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক দেশে এসব প্রাণী পাঠানো হতো।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, পাহাড়ি এলাকার স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে অর্থের বিনিময়ে বিরল প্রাণী সংগ্রহ করা হতো। এরপর সেগুলো ঢাকায় এনে গুদামজাত করা হতো। পাচারকারীরা নজরদারি এড়াতে জটিল ও দীর্ঘ রুট ব্যবহার করত, যাতে আন্তর্জাতিক পথে সহজে শনাক্ত না হয়।
কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, হাদিস রহমান একসময় কাঁটাবনের একটি দোকানে কাজ করলেও ধীরে ধীরে তিনি এই আন্তর্জাতিক চক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হন। পরে নিজস্ব ব্যবসার আড়ালে তিনি পাচার কার্যক্রম চালিয়ে যান। এর আগে একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও আইনি প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে তিনি বারবার বেরিয়ে এসে একই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
বন বিভাগের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট জানায়, সম্প্রতি মিরপুরের গুদামে অভিযানে ইগলপ্যাঁচা, চশমাপরা হনুমান, রাজধনেশ, লজ্জাবতী বানর, শজারু, গন্ধগোকুল এবং পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপসহ বিপন্ন ও সংরক্ষিত প্রজাতির প্রাণী উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একটি প্রাণী মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রাণী শুধু জীববৈচিত্র্যের অংশ নয়; বরং পুরো বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের অনিয়ন্ত্রিত শিকার ও পাচার পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা আরও জানান, বাংলাদেশ এখন আর কেবল উৎস দেশ নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রাণী পাচারের জন্য এই রুট ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দর ও সীমান্ত ব্যবহার করে অত্যন্ত সংগঠিতভাবে এই পাচার চালানো হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে অন্যান্য অপরাধ শনাক্তে যে নজরদারি থাকে, বন্যপ্রাণী পাচার শনাক্তে সেই সক্ষমতা এখনও সীমিত, যা এই চক্রকে সুবিধা দিচ্ছে। এ ঘটনায় তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। তারা বলছে, এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

