বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের জীবন বদলের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কৃষিঋণ চালু করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু সেই ঋণ ব্যবস্থাই যখন প্রতারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েন সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলো।
ঢাকার কেরানীগঞ্জের নতুন চর খাড়াকান্দির বাসিন্দা শরীফ শিকদারের ঘটনা তারই একটি উদাহরণ। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে খাসজমির ওপর একটি ছোট ঘরে বসবাস করেন তিনি। অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে সংসার চালান। কখনও নিজের জমিতে চাষ করেননি, এমনকি বর্গাচাষিও ছিলেন না। অথচ বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের হযরতপুর শাখার নথিতে দেখা যাচ্ছে, তাঁর নামে এক লাখ ১০ হাজার টাকার শস্যঋণ রয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, শরীফ নিজেই জানতেন না যে তাঁর নামে এত বড় ঋণ তৈরি হয়েছে।
শরীফের মতো আরও হাজারো প্রান্তিক মানুষ এমন ঋণের বোঝা বহন করছেন, যার টাকা তারা কখনও পুরোপুরি পাননি। স্থানীয় দালাল ও কিছু অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজশে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে ভুয়া ঋণ। সামান্য কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কেরানীগঞ্জের আরেক বাসিন্দা আমেনা বেগমের ঘটনাও একই রকম। স্বামীহারা এই নারী অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। নিজের কোনো ঘর নেই। তাঁর একমাত্র ছেলে পলাশ শিকদারের নামে ২০১৫ সালে ১৫ হাজার টাকার কৃষিঋণ তৈরি করা হয়। কিন্তু সেই ঋণের পুরো টাকা তিনি পাননি। স্থানীয় এক দালাল সাত হাজার টাকা নিয়ে নেয়, আর পলাশের হাতে দেওয়া হয় মাত্র আট হাজার টাকা।
এরপর ২০১৮ সালে নতুন করে ৩০ হাজার টাকার ঋণ দেখিয়ে আগের ঋণ সমন্বয় করা হয়। সুদসহ সেই ঋণের পরিমাণ এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৪৩৩ টাকায়। ছেলে বিদেশে চলে যাওয়ায় এখন সেই ঋণের দায় এসে পড়েছে আমেনা বেগমের ওপর।
শরীফ ও আমেনার মতো মানুষের সংখ্যা খুব কম নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে, শুধু কেরানীগঞ্জের হযরতপুর শাখাতেই নিয়মবহির্ভূতভাবে এক হাজার ৯২২টি ঋণের বিপরীতে ৯ কোটি ১২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ শাখা ও কুষ্টিয়া শাখাতেও। রূপগঞ্জে ৩১৫টি এবং কুষ্টিয়ায় ১৬৫টি সন্দেহজনক বা ভুয়া ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তে দেখা গেছে, যাদের নামে এসব ঋণ দেওয়া হয়েছে তাদের অধিকাংশই প্রকৃত কৃষক নন। কেউ দিনমজুর, কেউ রিকশা বা ভ্যানচালক, কেউ জেলে, কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ ছোট দোকানদার, আবার কেউ বেকার। অনেকেরই কৃষিকাজের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। শুধু জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সংগ্রহ করে তাদের নামে তৈরি করা হয়েছে ঋণের কাগজপত্র।
প্রতারণার একটি সাধারণ কৌশল ছিল মানুষকে বোঝানো যে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে না। অনেককে বলা হয়েছে, এটি সরকারি সহায়তা বা পরে মাফ হয়ে যাবে। দরিদ্র ও অশিক্ষিত মানুষ সেই কথায় বিশ্বাস করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে দেন। এরপর তাদের অজান্তেই তৈরি হয় বড় অঙ্কের ঋণ।
শরীফ শিকদার জানান, ২০০৮ সালে স্থানীয় এক ব্যক্তি তাঁকে বলেছিলেন, সরকার পরে ঋণ মাফ করে দেবে। সেই কথা বিশ্বাস করে তিনি নয় হাজার টাকা পান। তাঁর পরিচিত প্রায় ৯০ জন মানুষও একইভাবে ঋণের ফাঁদে পড়েন। পরে তিনি জানতে পারেন, তাঁর নামে ১৫ হাজার টাকার শস্যঋণ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, কৃষি ব্যাংকের হযরতপুর শাখার কর্মীরা বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছ থেকে চার দফায় মোট আড়াই হাজার টাকা নিয়েছেন। সম্প্রতি ব্যাংক থেকে ডেকে তাঁকে জানানো হয়, সুদসহ তাঁর ঋণের পরিমাণ এখন এক লাখ ১০ হাজার টাকা।
তদন্তে দেখা গেছে, শরীফের নামে একবার ঋণ তৈরি করার পর সেটি বারবার নবায়ন করা হয়েছে। নতুন ঋণ দেখিয়ে পুরোনো ঋণের দায় সমন্বয় করা হয়েছে। ২০১৮ সালে তাঁর নামে ৬৯ হাজার ৫০০ টাকা ঋণ বিতরণের তথ্য দেখানো হয়। ২০২৪ সালের জুন শেষে সেই ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯ হাজার ৬৮৭ টাকা।
শুধু শস্যঋণ নয়, গরুর খামারের নামেও হয়েছে বড় ধরনের অনিয়ম। কৃষি ব্যাংকের তদন্তে দেখা গেছে, হযরতপুর শাখা থেকে পাঁচজনের নামে গরু মোটাতাজাকরণের জন্য ৪ শতাংশ সুদে সাত লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ দেওয়া হয়। কিন্তু তদন্তকারী দল মাঠপর্যায়ে গিয়ে কারও কোনো গরুর খামার খুঁজে পায়নি।
এ ছাড়া ভুয়া জমির তথ্য, ভুল খতিয়ান ও অস্তিত্বহীন জমির বিবরণ ব্যবহার করে ভূমিহীন ও অকৃষকদের নামে এক হাজার ৯২২টি শস্যঋণ বিতরণ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জমির দাগ নম্বর, মালিকানা ও খতিয়ানের কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
এই অনিয়মগুলো ঘটে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে, যখন হযরতপুর শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন এম এম আজিজুল করিম। জালিয়াতির তথ্য পাওয়ার পর ২০২২ সালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তবে বর্তমানে তিনি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের নিরীক্ষা বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ শাখাতেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। তদন্তে দেখা গেছে, এমন জমির নামে ঋণ দেওয়া হয়েছে যেখানে বাস্তবে কৃষিকাজের কোনো সুযোগ নেই। পুলিশ সদস্যদের মালিকানাধীন আবাসন প্রকল্প, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রকল্পভুক্ত জমি এবং পূর্বাচলের জমিকে কৃষিজমি দেখিয়ে ঋণ দেওয়া হয়েছে।
২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রূপগঞ্জ শাখায় অন্তত ৩১৫টি ভুয়া ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ওই শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মাহবুব আলমের ব্যাংক হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে বেতন-ভাতার বাইরে প্রায় পাঁচ কোটি ৩৩ লাখ টাকা জমা ও সমপরিমাণ অর্থ উত্তোলন হয়েছে। নিরীক্ষা দল মনে করছে, এসব অর্থ ঘুষ বা ঋণের কমিশনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
রূপগঞ্জ শাখায় সরকারের সুদ ভর্তুকির আওতায় গরু পালনের জন্য দেওয়া বেশ কয়েকটি ঋণও সন্দেহজনক বলে তদন্তে উঠে এসেছে। যাদের নামে ঋণ দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেরই কোনো গরুর খামার নেই। এভাবে ১২টি ঋণের বিপরীতে মোট ৩৬ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
কুষ্টিয়া শাখাতেও ধরা পড়েছে বড় ধরনের অনিয়ম। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, ১৬৫টি ঋণের প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়নি। বারবার নির্দেশ দেওয়ার পরও অনেক ঋণের তথ্য কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে জমা দেওয়া হয়নি। এখন পর্যন্ত ১৯টি ঋণের কোনো তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে না।
এসব অনিয়মের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি ব্যাংককে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। একই সঙ্গে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঋণ জালিয়াতির পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটেও রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। উচ্চ খেলাপি ঋণ, বড় ধরনের লোকসান এবং মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকটি চাপের মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার ১০২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির পুঞ্জীভূত লোকসান ছিল আট হাজার ২৫৭ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অনেক মানুষের মধ্যে কৃষিঋণ নিলে তা ফেরত দিতে হয় না—এমন ভুল ধারণা রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দালাল ও অসাধু কর্মকর্তারা অনৈতিক সুবিধা নিতে পারে। ভুয়া ঋণের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন জানিয়েছেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কিছু অনিয়মের বিষয়ে ইতোমধ্যে জানতে পেরেছে। ভুয়া ঋণসহ সব ধরনের অনিয়ম খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে অডিট কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যাদের নামে ঋণ তৈরি হয়েছে অথচ যারা সেই অর্থ ব্যবহারই করেননি, তাদের দায় কেন বহন করতে হবে?
কৃষিঋণের উদ্দেশ্য ছিল দরিদ্র মানুষের জীবন বদলানো। কিন্তু সেই ব্যবস্থাই যদি দুর্নীতি ও প্রতারণার কারণে গরিব মানুষের জন্য নতুন বোঝায় পরিণত হয়, তাহলে শুধু কয়েক হাজার পরিবার নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা।
শরীফ শিকদারদের মতো মানুষের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—তাদের নামে তৈরি হওয়া ভুয়া ঋণের দায় থেকে মুক্তি এবং যারা এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা।

