একটি তামাক কোম্পানির বিনামূল্যে বিতরণের জন্য দেওয়া প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার গাছের চারা সামাজিক বন বিভাগে পৌঁছানোর পর রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে কুষ্টিয়ায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্ধারিত নার্সারি থেকে এসব চারা সংগ্রহ করে তা বিনামূল্যে বিতরণের বদলে বিক্রি করেছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারাই।
অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বছর ওই তামাক কোম্পানি কোনো সরকারি দপ্তরকে সরাসরি চারা সরবরাহ না করলেও বন বিভাগের কর্মকর্তারা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেখিয়ে সেই চারাগুলোই সংগ্রহ করেছেন। এরপর তার একটি অংশ প্রকৃত উপকারভোগীদের না দিয়ে বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই কোম্পানি এবার শুধু বেসরকারি সংস্থা ও সাধারণ মানুষের জন্যই বিনামূল্যে চারা সরবরাহ করছে। অতীতে বন বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরও এই সুবিধা পেত, তবে এবার সরাসরি সরকারি বরাদ্দ বন্ধ হওয়ায় বন বিভাগ ভিন্ন কৌশলে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে মোট পঞ্চাশ হাজার চারা বরাদ্দ করিয়ে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর একটি বড় অংশ, প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার চারা, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার একটি নির্দিষ্ট নার্সারি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সেই নার্সারির মালিক। তবে বন বিভাগের ভাষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন— তাদের দাবি অনুযায়ী তারা এ পর্যন্ত মাত্র চৌদ্দ হাজার চারা নিয়েছে। দুই পক্ষের হিসাবের এই বিশাল ফারাক নিয়েই মূলত প্রশ্ন উঠেছে।
প্রায় চার বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই নার্সারি ওই তামাক কোম্পানির দেশজুড়ে থাকা আঠারোটি নির্ধারিত নার্সারির একটি, আর মালিক প্রায় আঠারো বছর ধরে কোম্পানিটির জন্য চারা সরবরাহ করে আসছেন। তার ভাষ্যমতে, এবার কোম্পানি সরাসরি কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা সরকারি অনুষ্ঠানের জন্য চারা না দিলেও, অন্যের নামে কাগজপত্র তৈরি করে সেই চারা তুলে নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, বন বিভাগের লোকজন অন্তত পঁয়ত্রিশ হাজার চারা নিয়ে গেছেন, তবে একদিন স্থানীয় বাসিন্দা ও কয়েকজন সাংবাদিক তাদের একটি চারাবাহী ভ্যান আটকে দেওয়ার পর থেকে আর নতুন করে চারা নিতে আসেননি তারা। এখনও তাদের কিছু চারা বাকি আছে বলেও জানান তিনি।
নার্সারি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বন বিভাগের একটি নার্সারি থেকেই এসব বিনামূল্যের চারার একাংশ বিক্রি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কাছের বাজারের একজন ব্যবসায়ী জানান, প্রতিদিনই ভ্যানভর্তি চারা আসা-যাওয়া করে, ফলে ঠিক কোন উৎসের চারা বিক্রি হচ্ছে তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। স্থানীয় বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, বন বিভাগ তাদের নিজস্ব উৎপাদিত চারার সঙ্গে কোম্পানির দেওয়া বিনামূল্যের চারাও মিশিয়ে বিক্রি করছে, আবার কিছু চারা দিয়ে রেললাইনের পাশে বা খালের ধারে বাগানও করা হচ্ছে। এমনকি নার্সারি মালিক নিজেও স্বীকার করেছেন যে বন বিভাগ তাদের নিজস্ব উৎপাদিত চারা বিক্রি করে থাকে।
তবে অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন বন বিভাগের এক ডেপুটি রেঞ্জার। তিনি জানান, রাজনৈতিক নেতা, বেসরকারি সংস্থা এমনকি সাংবাদিকরাও প্রায়ই গাছের চারা চান, আর সেই চাহিদা মেটাতেই তারা ওই নার্সারি থেকে চৌদ্দ হাজার চারা এনেছেন। কিছু বিতরণ করা হলেও এখনও প্রায় তেরো হাজার চারা তাদের কাছে মজুত আছে বলে দাবি তার। তিনি স্পষ্ট করে জানান, তারা যা বিক্রি করছেন তা তাদের নিজস্ব উৎপাদিত চারা, কোম্পানির দেওয়া বিনামূল্যের চারা নয়।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জানান, ঠিক কত চারা আনা হয়েছে বা তা বিক্রি হয়েছে কি না, তার সঠিক জানা নেই। তবে এভাবে চারা সংগ্রহ করা ঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি এবং জানান, যতটুকু চারা তাদের কাছে ছিল, প্রয়োজন হলে সেখান থেকেই মানুষকে কিছু বিতরণ করা যেত।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক জানান, তিনি অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (সাধারণ) তদন্তের নির্দেশ দিচ্ছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
এই ঘটনা সরকারি দপ্তরের হাতে আসা বিনামূল্যের সহায়তা সামগ্রী বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতির একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নার্সারি মালিক ও বন বিভাগের পরস্পরবিরোধী হিসাবের মধ্যে প্রকৃত সত্য উদঘাটনে এখন মূলত নির্ভর করতে হচ্ছে প্রশাসনিক তদন্তের ওপরই। একইসঙ্গে এই ঘটনা আরও একবার প্রশ্ন তুলেছে, বেসরকারি খাতের সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক উদ্যোগ কীভাবে সরকারি পর্যায়ে বিতরণের সময় জবাবদিহিতার ঘাটতির শিকার হতে পারে।

