ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগের এক অধ্যাপকের ওপর ভয়াবহ হামলার ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারীসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন সানি সাহা এবং ফাতিন ইসরাক লাবিব। গত শনিবার রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়া এবং খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকা থেকে পৃথক অভিযানে তাদের আটক করা হয়।
আজ রোববার বেলা সাড়ে এগারোটায় ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেন গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গোয়েন্দা পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোল্লা মোহাম্মদ শাহীনও।
পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, গত সতেরোই আগস্ট রাত সাড়ে দশটার দিকে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখা শেষে বাসায় ফেরার পথে হামলার শিকার হন অধ্যাপক আসাদুর রহমান। রাত পৌনে এগারোটার দিকে একটি অটোরিকশায় ওঠার মুহূর্তে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর পথ আটকে দাঁড়ায়। এরপর তাঁকে জোর করে গাড়ি থেকে নামিয়ে মারধর শুরু করা হয়। হামলাকারীদের একজন তাঁর ডান চোখে সরাসরি আঘাত করে, আর বাকিরা মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে। এ সময় তাঁকে প্রাণনাশেরও হুমকি দেওয়া হয়।
স্থানীয় লোকজনের খবরে ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছায় পল্টন মডেল থানা পুলিশ। তাৎক্ষণিকভাবে হামলাকারীদের একজনকে আটক করা গেলেও বাকিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরে গুরুতর আহত অধ্যাপক আসাদুর রহমানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী অধ্যাপক নিজে বাদী হয়ে পল্টন মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, হামলার কয়েক দিন আগে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে তাঁর কাছে পনেরো হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করা হয়েছিল।
মামলা তদন্তের সূত্র ধরে হামলার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করে ডিবি। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার মধ্যরাতে যাত্রাবাড়ীর গোয়ালপাড়া-কদমতলী এলাকা থেকে সানি সাহাকে এবং পরে একই রাতে খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকা থেকে ফাতিন ইসরাক লাবিবকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে সানি সাহা জানান, দুই হাজার বাইশ থেকে পঁচিশ সাল পর্যন্ত তিনি সিঙ্গাপুরের একটি ইন্টেরিয়র ডিজাইন প্রতিষ্ঠানে প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, যিনি তাঁকে অর্থ পাচারের মাধ্যমে আয়ের প্রস্তাব দেন। এই ব্যবসায় বিনিয়োগ করে তিনি বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির শিকার হন বলে দাবি করেন।
দেশে ফেরার পর গত বছরের আগস্টে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সেই ব্যক্তির সঙ্গে আবার তাঁর দেখা হয়। এরপর সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত তথ্য—যেমন বাসার ঠিকানা, গাড়ির নম্বর, পেশা ও আর্থিক অবস্থা সংগ্রহের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয় বলে জানান সানি সাহা।
গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্যমতে, এভাবে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি দুজন চিকিৎসককে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়। এরই অংশ হিসেবে অধ্যাপক আসাদুর রহমানের ওপর হামলার জন্য লোক সংগ্রহের দায়িত্ব পান ফাতিন ইসরাক লাবিব।
জিজ্ঞাসাবাদে লাবিব জানান, ঘটনার প্রায় আড়াই মাস আগে খাবার সরবরাহ সংক্রান্ত এক মাধ্যমে সানি সাহার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, পরে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাঁদের সরাসরি সাক্ষাৎ ঘটে। এরপর তিনি আরও কয়েকজন তরুণকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে হামলায় অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেন।
পুলিশ জানায়, এই দলটিই পরিকল্পিতভাবে অধ্যাপক আসাদুর রহমানের ওপর হামলা চালায়। ঘটনায় জড়িত দুজন ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। এ ছাড়া গ্রেপ্তারকৃত সানি সাহা ও ফাতিন ইসরাক লাবিবের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে ভাটারা থানায় পৃথক আরেকটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।

