রাজধানীর রাস্তায় চলাচল এখন অনেকের কাছেই শুধু যাতায়াতের বিষয় নয়, নিরাপত্তারও বড় প্রশ্ন। নির্দিষ্ট কিছু ছিনতাইপ্রবণ এলাকা তো আছেই, পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সড়কেও ঘটছে ছিনতাই। এমনকি যেসব জায়গাকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করা হয়, সেখানেও আকস্মিক হামলার ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে শনিবার ভোরের ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও সামনে এনেছে। স্বামীর সঙ্গে রিকশায় করে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীনের হাতব্যাগ ধরে টান দেয়। হঠাৎ টানে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
ছিনতাইয়ের ঘটনায় প্রাণহানির এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, একটি ব্যাগ, মুঠোফোন বা টাকার জন্য সংঘটিত অপরাধ কত দ্রুত জীবনহানির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পুলিশের পরিসংখ্যানেও ছিনতাইয়ের পুরো চিত্র ধরা পড়ছে না। কারণ, অনেক ভুক্তভোগী মামলা করতে চান না। ফলে সরকারি হিসাবে যতগুলো ঘটনা উঠে আসে, বাস্তবে ছিনতাইয়ের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাত মাসে সারা দেশে মামলা ১,০৬৭
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে সারা দেশে ছিনতাইয়ের ১ হাজার ৬৭টি মামলা হয়েছে।
মাসভিত্তিক হিসাবেও অপরাধটির ধারাবাহিকতা দেখা যায়। জানুয়ারিতে সারা দেশে ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ১৬৩টি। ফেব্রুয়ারিতে ১৩৪টি, মার্চে ১৪২টি, এপ্রিলে ১৫২টি, মে মাসে ১৬৭টি, জুনে ১৪৯টি এবং জুলাইয়ে ১৬০টি মামলা হয়েছে।
অর্থাৎ কোনো একটি মাসে ছিনতাইয়ের ঘটনা হঠাৎ বেড়ে গিয়ে আবার পুরোপুরি কমে যায়নি। সাত মাসের প্রতিটি মাসেই শতাধিক মামলা হয়েছে। মে মাসে মামলার সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ১৬৭টি।
এই পরিসংখ্যানের আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। মামলা হয়েছে ১ হাজার ৬৭টি, কিন্তু প্রতিটি ছিনতাই যে থানায় মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে, এমন নয়। ফলে মামলার সংখ্যা দিয়ে বাস্তবে মানুষের ওপর ছিনতাইয়ের চাপ কতটা, তা পুরোপুরি বোঝা কঠিন।
ঢাকাতেই প্রায় ৪১ শতাংশ
সারা দেশের ছিনতাইয়ের মামলার একটি বড় অংশই ঢাকা বিভাগে। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ঢাকা রেঞ্জ ও ঢাকা মহানগর পুলিশ এলাকায় মোট ৪৪৩টি মামলা হয়েছে।
অর্থাৎ সারা দেশে হওয়া ১ হাজার ৬৭টি মামলার প্রায় ৪১.৫ শতাংশই ঢাকা বিভাগের আওতায়।
এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগর পুলিশের ৫০টি থানায় মামলা হয়েছে ১৮৯টি। অর্থাৎ ঢাকা বিভাগে ঢাকা মহানগর পুলিশের এলাকার বাইরে হয়েছে আরও ২২৫টি মামলা।
রাজধানীতে ছিনতাই বেশি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বিপুল জনসংখ্যা, প্রতিদিন লাখো মানুষের চলাচল, নগদ অর্থের লেনদেন, যানজট এবং ভোর ও রাতে তুলনামূলক নির্জন সড়ক—সব মিলিয়ে অপরাধীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ তৈরি হয়।
এর সঙ্গে রয়েছে ছিনতাই করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ। মোটরসাইকেল ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পথচারীর কাছ থেকে ব্যাগ বা মুঠোফোন ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত সরে পড়া এখন নগরের পরিচিত অপরাধ কৌশলগুলোর একটি।
গুরুত্বপূর্ণ সড়কও নিরাপদ নয়
জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের সড়কে প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনাটি তাই শুধু একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না।
বগুড়ার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। বাস থেকে নেমে স্বামীর সঙ্গে রিকশায় করে ফার্মগেটের একটি হাসপাতালে যাওয়ার সময় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা তাঁর হাতব্যাগ ধরে টান দেয়।
হঠাৎ টানে তিনি রিকশা থেকে সড়কে পড়ে যান। মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
নিহত শিক্ষিকার স্বামী আব্দুল মতিন মর্গের সামনে বলেন, সংসদ ভবনের সামনের মতো নিরাপদ বলে মনে করা একটি এলাকায় এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তা তাঁর ধারণায় ছিল না।
ঘটনার পর র্যাব রোববার দুজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে।
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ছিনতাইয়ের ঝুঁকি শুধু অন্ধকার গলি বা অপরিচিত এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও পথচারীকে লক্ষ্য করে অপরাধীরা সুযোগ নিতে পারে।
এর আগেও বড় অঙ্কের টাকা ছিনতাই
রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময়ের ছিনতাইয়ের আরেকটি ঘটনা ছিল আরও বড় অঙ্কের অর্থ নিয়ে। ১০ আগস্ট উত্তরা এলাকায় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার সময় একটি গাড়ি থামিয়ে ডিএল পেট্রলপাম্পের কর্মীদের কাছ থেকে ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা।
এ ঘটনায় গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাব অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।
একদিকে পথচারীর মুঠোফোন বা ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বড় অঙ্কের অর্থ বহনকারী ব্যক্তিরাও অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। অর্থাৎ ছিনতাইয়ের ধরনও একমাত্রিক নয়।
নারীরাও বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছেন। চলন্ত রিকশা বা যানবাহনে থাকা নারীদের ব্যাগ টেনে নেওয়া ছিনতাইকারীদের একটি পরিচিত কৌশল। এ ক্ষেত্রে ব্যাগের সঙ্গে মানুষও রাস্তায় পড়ে যেতে পারেন। ফলে সামান্য অর্থ বা মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা মুহূর্তেই বড় দুর্ঘটনায় রূপ নিতে পারে।
চট্টগ্রামেও উল্লেখযোগ্য ছিনতাই
পুলিশের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ঢাকা বিভাগের পর সবচেয়ে বেশি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। সেখানে মামলা হয়েছে ২০৯টি।
এর পর রাজশাহী বিভাগে ১২০টি, খুলনায় ১০২টি, সিলেটে ৬৬টি, রংপুরে ৪৩টি, ময়মনসিংহে ৩৩টি এবং বরিশালে ৩০টি মামলা হয়েছে।
রেলওয়ে এলাকায়ও সাত মাসে ২১টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে।
এই হিসাব থেকে দেখা যায়, ছিনতাই কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক অপরাধ নয়। দেশের বড় শহর, জনবহুল এলাকা এবং মানুষের চলাচল বেশি এমন বিভিন্ন জায়গাতেই এ ধরনের অপরাধের ঝুঁকি রয়েছে।
তবে ঢাকা বিভাগের মামলার সংখ্যা অন্য অঞ্চলগুলোর তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় রাজধানী ও আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়।
মামলার বাইরেই থেকে যাচ্ছে অনেক ঘটনা
ছিনতাইয়ের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগই করেন না।
মানবাধিকার সংগঠন ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ছিনতাইয়ের ঘটনায় ভুক্তভোগী আহত বা নিহত না হলে কিংবা বড় অঙ্কের টাকা বা মূল্যবান সম্পদ খোয়া না গেলে অনেকেই মামলা করতে চান না। কেউ কেউ মামলা না করে সাধারণ ডায়েরি করেন, আবার অনেকে কোনো অভিযোগই করেন না।
এর ফলে পুলিশের নথিতে যে সংখ্যা দেখা যায়, সেটিই বাস্তব ছিনতাইয়ের সংখ্যা—এমন ধারণা করার সুযোগ নেই।
মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিংয়ের ৩ নম্বর সড়কের মাথায় গত জুনে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। বেড়িবাঁধে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে মুঠোফোন ও মানিব্যাগ হারান একটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মী ইমতিয়াজ ও সাদমান।
কিন্তু তাঁরা মামলা করেননি। সাদমান শুধু মুঠোফোন হারানোর বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। ইমতিয়াজ সেটিও করেননি।
তাঁর যুক্তি ছিল, মামলা বা সাধারণ ডায়েরি করলেও হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার তেমন আশা নেই।
এই ধরনের মানসিকতা ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করে। ভুক্তভোগীরা যদি অভিযোগ না করেন, তাহলে কোন এলাকায় কত ঘটনা ঘটছে, কোন সময়ে ঝুঁকি বেশি এবং কী ধরনের অপরাধী সক্রিয়—এসব বিষয়ে পুলিশের কাছেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পৌঁছায় না।
গ্রেপ্তার হচ্ছে, কিন্তু অপরাধ থামছে না কেন
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। কিন্তু সমস্যা হলো, গ্রেপ্তারের পরও কিছু আসামি জামিনে বের হয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
এখানেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বড় একটি দুর্বলতা সামনে আসে। শুধু গ্রেপ্তার করলেই অপরাধের স্থায়ী সমাধান হয় না। গ্রেপ্তারের পর তদন্ত, বিচার এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক মনে করেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি হলে তা অন্যদের জন্যও নিরুৎসাহের কারণ হতে পারে।
রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, চলন্ত রিকশা থেকে নারীর ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে মোটরসাইকেল বা গাড়ি ব্যবহার নগরে পরিচিত কৌশল। এতে শুধু টাকা বা মূল্যবান জিনিস হারানোর ঝুঁকি থাকে না, প্রাণহানির আশঙ্কাও থাকে।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই ঝুঁকিকে অত্যন্ত নির্মমভাবে সামনে এনেছে।
ভোর ও রাতে বাড়ছে ঝুঁকি
রাজধানীর কিছু এলাকায় ভোর ও রাতে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। দিনের ব্যস্ত সময়ে মানুষের ভিড় থাকলেও ভোরের দিকে অনেক সড়ক ফাঁকা হয়ে যায়। রাতেও কিছু এলাকায় মানুষের চলাচল কমে আসে।
এ সময় পর্যাপ্ত সড়কবাতি, নিয়মিত টহল ও নজরদারি না থাকলে অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়।
যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ এলাকার এক বাসিন্দা জানান, ওইসব এলাকায় নিয়মিত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটায় পথ চলার সময় ভয় কাজ করে।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা শুধু একটি এলাকার মানুষের নয়। রাজধানীর বিভিন্ন অংশে রাত বা ভোরে চলাচলকারী মানুষের মধ্যে ছিনতাইয়ের আতঙ্ক রয়েছে।
পুলিশের নতুন করে নজরদারি
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর পুলিশ সদর দপ্তর সারা দেশে ছিনতাইকারীদের তালিকা অনুযায়ী গ্রেপ্তারে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিটি পুলিশ ইউনিটকে নিজ নিজ এলাকার তালিকা ধরে অভিযান পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও জনসংযোগ শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, ছিনতাইকারীদের তালিকা করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর কাছে তাদের এলাকার তালিকাও রয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তবে অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে পুলিশের সব ইউনিটকে টহল আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু পুলিশি টহল কি যথেষ্ট?
ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে পুলিশের টহল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেবল টহল বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কারণ ছিনতাইয়ের পেছনে শুধু অপরাধীর উপস্থিতিই নয়, নগরের পরিবেশও ভূমিকা রাখে। কোথায় আলো কম, কোথায় নজরদারি নেই, কোথায় যানজটের কারণে গাড়ি ধীরগতিতে চলে, কোথায় দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা রয়েছে—এসব বিষয় অপরাধীরা কাজে লাগায়।
তাই ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আলোর ব্যবস্থা, পর্যবেক্ষণ বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নজরদারি এবং অপরাধীদের চলাচলের ধরন বিশ্লেষণ করাও জরুরি।
এর সঙ্গে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে গ্রেপ্তার ও শাস্তির মধ্যে একটি কার্যকর যোগসূত্র তৈরি হবে।
মামলার সংখ্যা কম মানেই নিরাপত্তা বেশি নয়
সাত মাসে সারা দেশে ১ হাজার ৬৭টি মামলা—সংখ্যাটি প্রথম দেখায় হয়তো খুব বড় মনে হতে পারে। কিন্তু অভিযোগ না করা ভুক্তভোগীদের হিসাব এতে নেই।
ঢাকা মহানগরের ৫০টি থানায় মামলা হয়েছে ১৮৯টি। অথচ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত ছিনতাইয়ের অভিজ্ঞতার কথা মানুষ জানাচ্ছেন। তাই শুধু থানায় নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা দিয়ে নগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিচার করলে বাস্তব চিত্রের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যেতে পারে।
বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—মানুষ রাস্তায় কতটা নিরাপদ বোধ করছে, ছিনতাইয়ের পর কতজন অভিযোগ করছেন, গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধীদের কতজনের বিচার শেষ হচ্ছে এবং একই অপরাধে পুনরায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কতটা কমানো যাচ্ছে।
রনজিলা পারভীনের মৃত্যু এই প্রশ্নগুলোকে আরও জরুরি করে তুলেছে। কারণ ছিনতাইয়ের শিকার একজন মানুষের কাছে হারানো মুঠোফোন বা টাকা হয়তো বড় ক্ষতি, কিন্তু সেই ঘটনা যদি প্রাণহানিতে গড়ায়, তখন সেটি আর সাধারণ সম্পদহানির অপরাধ থাকে না।
রাজধানীর পথ চলা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাই ছিনতাইকে ছোটখাটো অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সাত মাসের পরিসংখ্যান যেমন উদ্বেগ তৈরি করছে, তেমনি মামলা না হওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে অন্ধকারে থাকা বাস্তব পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত নিরাপদ সড়ক মানে শুধু যানজটমুক্ত সড়ক নয়। একজন মানুষ ভোরে, রাতে কিংবা দিনের ব্যস্ত সময়ে নিশ্চিন্তে রাস্তায় চলতে পারবেন—সেই নিশ্চয়তাও নগর নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। আর সেই নিশ্চয়তা ফিরিয়ে আনতে হলে অভিযান, নজরদারি, বিচার ও শাস্তি—সবকিছুকেই একই সঙ্গে কার্যকর করতে হবে।

