সরকারি মালিকানাধীন আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডে (এপিএসসিএল) গত তিন অর্থবছরে বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে সরকারি নিরীক্ষায়। ২০৮ পৃষ্ঠার নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কোম্পানিটির ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়ম, আর্থিক ক্ষতি এবং নিয়মবহির্ভূত ব্যয়ের একাধিক ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন বছরের হিসাব পর্যালোচনায় মোট ৯ হাজার ৬৯৭ কোটি ৫০ লাখ ৭০ হাজার ৪৩৫ টাকার অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত ৩৫টি ক্ষেত্রে জড়িত অর্থের পরিমাণ ৭ হাজার ৬৯৭ কোটি ১১ লাখ ৭০ হাজার ৮৩৪ টাকা। বাকি ১০টি বিষয়কে সাধারণ অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশের অন্যতম বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে ছয়টি ইউনিটের মাধ্যমে মোট ১ হাজার ৬৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
বিপিডিবির কাছে পাওনা আদায় না করায় বড় ক্ষতি
অডিট প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতির একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির পাওনা নির্ধারিত সময়ে আদায় না করা। এ কারণে কোম্পানির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৫ হাজার ৬৬০ কোটি ২৯ লাখ ২৭ হাজার ২৪৮ টাকা।
এ ছাড়া উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কম বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৮ হাজার ৬৮৬ কোটি ৬২ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৭ টাকা—যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সবচেয়ে বড় অঙ্কের ক্ষতিগুলোর একটি।
গ্যাস ব্যবহারের হিসাব অনুযায়ী বিল না করে নির্ধারিত হারের ভিত্তিতে গ্যাস বিল আদায় করায় আরও ৬৩ কোটি ৮১ লাখ ৩৫ হাজার ৬২০ টাকা আর্থিক ক্ষতির কথা বলা হয়েছে।
ত্রুটি মেরামতের খরচও গেছে কোম্পানির তহবিল থেকে
৪৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সিসিপিপি (ইস্ট) বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঠিকাদারের দায়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ২০২৩ সালের মে মাসে কেন্দ্রটি বন্ধ করে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে হওয়া ত্রুটির দায় ঠিকাদারের কাছ থেকে আদায় না করে কোম্পানির নিজস্ব অর্থে মেরামত করা হয়। এতে ১০৯ কোটি ৬২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
একইভাবে, ত্রুটির কারণে কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হলেও ঠিকাদারের কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী কার্যকর করার নিশ্চয়তা বাজেয়াপ্ত না করায় আরও ১৪৮ কোটি ৪৬ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯১ টাকা ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুমোদিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় কেন্দ্র বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়। এতে কোম্পানির রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ৬৯৮ কোটি ৯২ লাখ ৪ হাজার ৭৪০ টাকা।
শেয়ার লভ্যাংশ নিয়েও প্রশ্ন
আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি, ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি এবং ইউনাইটেড আশুগঞ্জ এনার্জির মধ্যে ২০১৩ সালে শেয়ার ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তির আওতায় এপিএসসিএল ইউনাইটেডের কাছ থেকে ২৯ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা পাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, ঘোষিত লভ্যাংশের তুলনায় এপিএসসিএলকে কম হারে লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে। এতে কোম্পানির ১১৪ কোটি ১ লাখ ৫ হাজার ১১ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে এপিএসসিএলের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মো. সবুর হোসেন জানান, ইউনাইটেড পাওয়ারের শেয়ারসংক্রান্ত বিষয়টি তার জানা আছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আশুগঞ্জ পাওয়ারের ২৯ শতাংশ শেয়ার পাওয়ার কথা থাকলেও তারা পেয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ।
তিনি বলেন, উঠে আসা বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তার অবস্থান কঠোর এবং তিনি নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো অনিয়ম হতে দেবেন না।
পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্পেও অনিয়ম
এপিএসসিএলের আওতাধীন পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টের ভূমি অধিগ্রহণ, উন্নয়ন ও সংরক্ষণ প্রকল্পেও একাধিক অনিয়মের তথ্য পেয়েছে নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান না হওয়া সত্ত্বেও একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে চুক্তি করা হয়। এতে ৩৯০ কোটি ৭৮ লাখ ৭২ হাজার ১১৮ টাকা অনিয়মিতভাবে ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।
নির্ধারিত সময়ে কাজ বা পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ ঠিকাদারের কাছ থেকে বিলম্ব জরিমানা আদায় না করে বিল পরিশোধ করায় আরও ৩৮ কোটি ৬৪ লাখ ২৯ হাজার ৪৯২ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও সমাপ্তি ঘোষণা, বাস্তবে মালামাল সরবরাহ না করেও বিল পরিশোধ এবং দরপত্র প্রস্তুতের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কমিটি না গঠনসহ বিভিন্ন অনিয়মের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রয়োজন না থাকলেও যন্ত্রপাতি কেনার অভিযোগ
আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবসরপ্রাপ্ত দুটি ইউনিটের বিক্রির সময় সম্পদের মূল্য নির্ধারণেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্যালভেজ মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক কম মূল্য নির্ধারণের কারণে কোম্পানির ক্ষতি হয়েছে ৪২ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও গ্যাস বুস্টার কম্প্রেসার কেনায় ৫৪ কোটি ৬৮ লাখ ৮৭ হাজার ৩৭১ টাকা আর্থিক ক্ষতির কথা বলা হয়েছে।
বন্ধ ঘোষণা করা প্লান্টের জন্য প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন মালামাল কেনার কারণে আরও ২০ কোটি ৬২ লাখ ৮০ হাজার ৪৭৫ টাকা ক্ষতির তথ্য রয়েছে প্রতিবেদনে।
রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি সেবা চুক্তির আওতায় মালামালের জন্য অর্থ পরিশোধ করা হলেও সেগুলো গ্রহণ করা হয়নি। এতে অনিয়মিত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৪ কোটি ৮৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৫৪ টাকা।
কর্মীদের সুবিধা ও গাড়ি ব্যবহারে অনিয়ম
অডিটে কর্মীদের ওভারটাইম ভাতা, অগ্রিম অর্থ সমন্বয়, বাসা বরাদ্দ ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও নানা অসঙ্গতি ধরা পড়েছে।
প্লান্ট বন্ধ থাকা অবস্থায় কর্মীদের ওভারটাইম ভাতা দেওয়ায় ১ কোটি ৬১ লাখ ৩১ হাজার ১৭ টাকা আর্থিক ক্ষতির কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন কর্মকর্তাকে দেওয়া অগ্রিম নির্ধারিত সময়ে সমন্বয় না করায় ক্ষতির পরিমাণ ৭ কোটি ৯২ লাখ ৮০ হাজার ৯৮১ টাকা।
কোম্পানির আবাসিক ভবনে পৃথক মিটার না বসিয়ে একক মিটারের মাধ্যমে বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ বিল কোম্পানির তহবিল থেকে পরিশোধ করায় ৯ কোটি ৪৮ লাখ ৪৪ হাজার ৮২৭ টাকা অনিয়মিত ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া পর্যাপ্ত নিজস্ব গাড়ি থাকার পরও ভাড়ার গাড়ি ব্যবহার করায় ২ কোটি ৫৪ লাখ ৮০ হাজার ৮০ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও যেসব অনিয়ম উঠে এসেছে
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বীমা না করায় বীমা প্রিমিয়াম ও এর ওপর প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর বাবদ সরকারের ১৪ কোটি ৭৯ লাখ ১০ হাজার ১২৫ টাকা ক্ষতি হয়েছে।
সরকারের শেয়ার মালিকানার বিপরীতে ঘোষিত লভ্যাংশ পরিশোধ না করায় সরকারের ৩ কোটি ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৫ টাকা আর্থিক ক্ষতির কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতাকে বিক্রয়াদেশ না দেওয়া, বিক্রয়াদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিলম্ব জরিমানা আদায় না করা, প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল দেওয়া এবং নির্ধারিত নিয়ম না মেনে বিভিন্ন ক্রয় ও চুক্তি করার ঘটনাও অডিটে উঠে এসেছে।
পটুয়াখালী প্রকল্পে সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে কাজ করায় ৬৩৭ কোটি ২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা অনিয়মিত ব্যয়ের তথ্য দেওয়া হয়েছে। একই প্রকল্পে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু না হওয়ায় বিদ্যুৎ বিক্রির ক্ষেত্রে ৮২ কোটি ১৯ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
জবাবদিহির প্রশ্ন
এপিএসসিএলের গত তিন বছরের কার্যক্রম নিয়ে করা এই অডিটে মোট ৪৫টি অনুচ্ছেদ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম এবং ১০টি সাধারণ অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদন নিয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সানাউল হক এবং নির্বাহী পরিচালক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মো. সবুর হোসেন বলেন, তিনি এখনো পুরো অডিট প্রতিবেদন দেখেননি এবং এতে থাকা অসঙ্গতিগুলো তাকে জানানো হয়নি।
তবে তার বক্তব্য, যেসব অনিয়ম বা দুর্নীতির তথ্য সামনে আসছে, সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ পেলে সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

