দেড় বছর আগে সংসারের অভাব ঘোচাতে বাবার হাত ধরে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজে পাঠানো হয়েছিল এগারো বছরের এক শিশুকে। ফিরে এলো সে শরীরজুড়ে ক্ষতচিহ্ন আর প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি অবস্থায়। বর্তমানে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের একটি কেবিনে চিকিৎসাধীন শিশুটির শারীরিক অবস্থাকে চিকিৎসকরা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন।
শিশুটির ভাষ্যমতে, দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তার ওপর চালানো হয়েছে নির্মম নির্যাতন। সামান্য কারণেই তাকে মারধর করা হতো, শরীরের বিভিন্ন অংশে গরম খুন্তি দিয়ে দেওয়া হতো ছ্যাঁকা। দিনের বড় একটা অংশ তাকে আটকে রাখা হতো টয়লেটে, খাবারও দেওয়া হতো না ঠিকমতো। এই পুরো সময়ে বাবার সঙ্গে একবারের জন্যও কথা বলার সুযোগ পায়নি সে।
গত শুক্রবার গভীর রাতে ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে শিশুটিকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শয্যা সংকটের কারণে শুরুতে মেঝেতেই তার চিকিৎসা চলছিল, আজ বৃহস্পতিবার তাকে একটি কেবিনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দেখা যায়, নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে ঢাকায় গেছেন শিশুটির বাবা। এই মুহূর্তে তার পাশে আছেন ষাটোর্ধ্ব দাদি, যিনি নাতনির দিকে তাকিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। কথা বলার সময় তিনি জানান, দারিদ্র্যের কারণেই মা-হারা নাতনিকে অন্যের বাসায় পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা, এই আশায় যে অন্তত পেট ভরে খেতে পারবে। কিন্তু বদলে ফিরে পেয়েছেন প্রায়-মৃত এক নাতনিকে। চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে পাঠানোর পরামর্শ দিলেও, সেই খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই পরিবারের।
হাসপাতালের একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা জানান, শিশুটির শরীরে দীর্ঘমেয়াদি নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে এবং দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকা ও নির্যাতনের কারণে তার শরীর মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার জীবন বাঁচাতে দ্রুত উন্নত চিকিৎসা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যে ঢাকার এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কলাবাগান এলাকা থেকে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তাদের ধরা হয়। স্থানীয় থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, শিশুটির বাবার করা মামলার ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
জানা গেছে, শিশুটির বাড়ি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলায়। বাবা পেশায় দিনমজুর, মা আগেই মারা গেছেন। সংসারের অভাব কমাতে প্রায় দেড় বছর আগে মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া মেয়েকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠান বাবা। এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা হয়েছিল, যিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন মেয়েকে ভালো রাখা হবে এবং কাজের ফাঁকে পড়ালেখারও ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু বাবা জানতেনই না ঠিক কোথায়, কার বাসায় রাখা হচ্ছে তার মেয়েকে।
শিশুটির বর্ণনা অনুযায়ী, তাকে প্রথমে ফেনীতে একজনের কাছে রাখা হয়, পরে সেখান থেকে ঢাকার একটি বাসায় পাঠানো হয়। সেই বাসাতেই শুরু হয় তার ওপর নিয়মিত নির্যাতন। কয়েকদিন আগে মাথা ও থুতনিতে গুরুতর আঘাতের ঘটনার পর তাকে প্রথমে ফেনী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। খবর পেয়ে বাবা ছুটে যান সেখানে, এরপর গভীর রাতে মেয়েকে নিয়ে পৌঁছান খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে।
এই ঘটনা আরও একবার সামনে নিয়ে এলো শিশুশ্রম, বিশেষত গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ চিত্র। মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে অচেনা পরিবারে শিশু পাঠানোর এই প্রচলিত প্রথা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে এই ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দারিদ্র্যের কারণে শিশুদের গৃহকর্মে পাঠানোর প্রবণতা রোধে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি, গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত শিশুদের অবস্থা নিয়মিত তদারকির মতো ব্যবস্থাও জরুরি হয়ে পড়েছে।

