একসময় লাভজনক হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে গভীর সংকটে নিমজ্জিত। খেলাপি ঋণ, বড় ধরনের লোকসান এবং আর্থিক অনিয়ম এই খাতকে ক্রমশ দুর্বল করে তুলেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৯টি ব্যাংক মিলে ১ হাজার ৬৬৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকার লোকসান করেছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা এই অবস্থার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতি, নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর অপব্যবহার এবং যোগ্য নেতৃত্বের অভাবকে দায়ী করছেন।
অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেছেন, “বিগত কয়েক দশকে ব্যাংকিং খাতের উপর রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্নীতির শৃঙ্খল আরোপ করা হয়েছে। একসময় লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও লাগামহীন লুটপাটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। সাধারণ মানুষের জমানো অর্থ লুটের শিকার হয়েছে, যা এই সংকটের মূল কারণ।”
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান একমত পোষণ করে বলেন, “ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর আর্থিক কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। এমনকি এই অর্থ দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ইউনিয়ন ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংক এ প্রান্তিকে বড় ধরনের লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক, যার লোকসান গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বেড়েছে।
এক্সিম ব্যাংক এ প্রান্তিকে ৫৬৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা লোকসান করেছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে তাদের মুনাফা ছিল ৫৩৩ কোটি টাকা। ব্যাংক এশিয়া, ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকেরও লোকসান বেড়েছে, যা প্রমাণ করে যে পুরো ব্যাংকিং খাতের অর্থনৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
২০১৭ সালের পর, এস আলম গ্রুপের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভুয়া কোম্পানি এবং তাদের সহযোগীরা কাগজে-কলমে বিশাল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে, এই অর্থ পরে সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে।
ব্যাংকগুলোতে এই ধরণের লুটপাট এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ফলে সাধারণ গ্রাহকের আস্থা ক্রমশ নষ্ট হচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক আন্তর্জাতিক অডিট ফার্ম নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর সম্পদ পুনর্মূল্যায়নের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ খাত পুনর্গঠনের জন্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রণয়ন এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকাংশে ব্যাংকিং খাতের উপর নির্ভরশীল। এ খাত যদি সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে না পায়। তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

