সিগারেটের ফিল্টার তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ‘সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো’ আমদানির ক্ষেত্রে একটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহারের ঘটনা উদ্ঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)। এই অনুসন্ধানের সূত্র ধরে একটি চালান আটক করে প্রায় সাড়ে ষোলো কোটি টাকা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে দুই কনটেইনারে আসা প্রায় আটচল্লিশ হাজার কেজি অ্যাসিটেট টোর একটি চালান শনাক্ত করে আটকে দেয় সিআইসি। সংস্থাটির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই একই পরিমাণ কাঁচামাল যদি স্থানীয়ভাবে সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত হতো, তাহলে এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারত প্রায় ৩২৪ কোটি টাকার রাজস্ব—যা মূল আমদানি পর্যায়ের রাজস্বের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
তবে বিষয়টি একটি চালানেই সীমাবদ্ধ নয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, একই প্রতিষ্ঠান এক অর্থবছরেই তিন লাখ বাষট্টি হাজার কেজির বেশি অ্যাসিটেট টো আমদানি করেছে। এর পাশাপাশি আরও চারটি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলোর নিবন্ধিত ঠিকানায় গিয়ে কোনো বাস্তব ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগ।
অ্যাসিটেট টো সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর একটি পণ্য, যা কেবল সিগারেটের ফিল্টার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। সম্প্রতি বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মাধ্যমে এই পণ্যের আমদানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সিআইসি এর প্রকৃত ব্যবহার, সরবরাহ প্রক্রিয়া এবং শেষ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করে। এই বিশ্লেষণেই একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা পণ্য শেষ পর্যন্ত কোথায় সরবরাহ হচ্ছে, তা জানতে ভ্যাট বিভাগের কাছে তথ্য চায় সিআইসি। জবাবে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ঠিকানায় কোনো কার্যক্রমই নেই, এবং নিয়মিত ভ্যাট রিটার্নও জমা দেওয়া হচ্ছে না। এই তথ্যের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যত অস্তিত্বহীন বলে চিহ্নিত করা হয়।
গত আগস্টে একটি নির্দিষ্ট বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে আটচল্লিশ হাজার কেজির বেশি অ্যাসিটেট টো আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু আমদানিকারকের অস্তিত্ব না থাকার তথ্য সামনে আসার পর সরকারের রাজস্ব সুরক্ষার স্বার্থে চালানটির খালাস প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেওয়া হয়। এই চালানে আমদানি পর্যায়ে জড়িত ছিল প্রায় সাড়ে ষোলো কোটি টাকার রাজস্ব, যা পরবর্তীতে আদায় নিশ্চিত করা হয়।
সিআইসির বিশ্লেষণ বলছে, দুটি সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর দলিল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতি কেজি অ্যাসিটেট টো থেকে প্রায় নয় হাজার শলাকা সিগারেট তৈরি করা সম্ভব। এই হিসাবে আটকে দেওয়া চালানের পুরো পরিমাণ কাঁচামাল দিয়ে প্রায় চুয়াল্লিশ কোটি শলাকা সিগারেট উৎপাদন সম্ভব হতো, যা দশ শলাকার প্যাকেট হিসাবে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে চার কোটি প্যাকেটের কাছাকাছি।
মাঝারি মানের সিগারেটের বাজারমূল্য ও প্রযোজ্য শুল্ক-করের হার হিসাব করলে এই পরিমাণ সিগারেটের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারত প্রায় ৩২৪ কোটি টাকার রাজস্ব। আর একই পরিমাণ কাঁচামাল উচ্চমানের সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত হলে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়াতে পারত প্রায় ৫৬৪ কোটি টাকায়। তবে সিআইসি স্পষ্ট করেছে, এই হিসাবগুলো সম্ভাব্য রাজস্বের একটি প্রাক্কলন মাত্র—চালানটি বাস্তবে সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, তা এখনো তদন্তের বিষয়।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, একই প্রতিষ্ঠান গত অর্থবছরে মোট তিন লাখ বাষট্টি হাজার আটশর বেশি কেজি অ্যাসিটেট টো আমদানি করেছে। এত বিপুল পরিমাণ সংবেদনশীল কাঁচামালের প্রকৃত ব্যবহার, ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান এবং সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে, যা নিয়ে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই চালাচ্ছে সিআইসি।
এই অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় আরও চারটি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেয়েছে সিআইসি, যেগুলোর নিবন্ধিত ঠিকানায় কোনো বাস্তব ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই বলে ভ্যাট বিভাগ নিশ্চিত করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোও নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় কর দলিল জমা দিচ্ছে না।
সিআইসির প্রাথমিক ধারণা, কিছু প্রতিষ্ঠান নামমাত্র নিবন্ধন নিয়ে উচ্চ রাজস্ব সংশ্লিষ্ট এই কাঁচামাল আমদানি করে পরে তা অবৈধভাবে বিক্রি বা হস্তান্তর করছে। এর ফলে শুধু আমদানি পর্যায়েই নয়, স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়েও বড় ধরনের রাজস্ব ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা পণ্যের প্রকৃত ব্যবহারকারী, সরবরাহের গন্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে, এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে এনবিআর সংশ্লিষ্ট সব ভ্যাট কমিশনারেটকে অ্যাসিটেট টোর সম্পূর্ণ সরবরাহ প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে। রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, শুধু আমদানিকারকের অস্তিত্ব যাচাই করাই যথেষ্ট নয়—আমদানির পর পণ্যটি আসলে কার কাছে যাচ্ছে, কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে এবং পরবর্তীতে তা বিক্রি বা হস্তান্তর করা হচ্ছে কি না, এই সম্পূর্ণ শৃঙ্খলটি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সিআইসির এই উদ্যোগের ফলে একদিকে একটি চালান থেকে সরাসরি রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে দেশের সংবেদনশীল শিল্প কাঁচামাল আমদানিতে সম্ভাব্য এক বড় অনিয়মের চক্র উন্মোচনের সুযোগও তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংবেদনশীল পণ্য আমদানির ঘটনা যদি নিয়মিত তদারকির আওতায় না আসে, তবে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের রাজস্ব খাতে আরও বড় ধরনের ক্ষতির শঙ্কা থেকে যায়।

