রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর ও মিরপুরে জমি ও ভবন দখলের চেষ্টা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর ও লুটপাটের তিনটি ঘটনায় কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রধান তিন আসামি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর বাইরে ইসিবি চত্বরের কাছে একটি আবাসন প্রকল্পে হামলা ও এক কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ যাঁকে হামলার নেপথ্যে থাকার কথা বলেছিল, সেই অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেলও পলাতক। সব মিলিয়ে চারটি ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন অন্তত ৩৭ জন, অথচ মূল অভিযুক্তেরা এখনো আইনের আওতার বাইরে।
চাঁদ উদ্যান, আদাবর ও রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি যথাক্রমে মোস্তাকের রহমান খোকন চৌধুরী, খুরশীদ আলম খান ও হানিফ মিয়া। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, তিনজনেরই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। পুলিশ বলছে, তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে খোকন চৌধুরী বারবার জায়গা বদলাচ্ছেন, খুরশীদ আলম খান দেশের বাইরে আছেন, আর হানিফ মিয়াকে তাঁর পরিচিত কোনো ঠিকানায় পাওয়া যাচ্ছে না।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে কয়েকশ মানুষ একটি অফিসে ভাঙচুর চালায়। তারা নগদ টাকা, সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র লুট করে জমিটি ঘিরে ফেলে। দিনের আলোয় ঘটা এই ঘটনাস্থল থেকে পুলিশের বিট অফিস মাত্র ১০০ ফুট দূরে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় খোকনসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০-২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ এ পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে।
মোহাম্মদপুর থানার ওসি মো. আব্দুল হালিম বলেন, বাকি আসামিদের ধরতে অভিযান চলছে। তাঁর ভাষ্য, খোকন মিরপুর ও কাফরুলের মধ্যে বারবার অবস্থান বদলাচ্ছেন, ফলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে খোকন চৌধুরী নিজেকে পলাতক বলে মানতে নারাজ। তিনি দাবি করেন, তিনি আত্মগোপনে নেই। তাঁর ভাষ্য, গতকালও তিনি চাঁদ উদ্যানে গিয়েছিলেন, আজও গিয়েছেন। লুকানোর মতো কিছু নেই তাঁর। তিনি হামলা করেননি বলেও দাবি করেন। খোকন জানান, ওই জমির পাশেই তাঁর বাড়ি, এলাকার সবাই তাঁকে দেখেছে। ফলে পালানোর প্রশ্নই ওঠে না। নিজের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে তিনি বলেন, ভোলায় তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং একসময় সেখানে দলের একটি পদেও ছিলেন।
একই দিন, অর্থাৎ ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৬টার দিকে আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ের একটি বহুতল ভবনে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা চালায় ১৫-২০ জনের একটি সশস্ত্র দল। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশধারী কয়েকজন ভবনের গেট ও জানালায় হামলা চালাচ্ছেন। আদাবর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নুরুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মূল অভিযুক্ত খুরশীদ আলম খান বিদেশে অবস্থান করছেন। রমনা থানা জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম জানান, খুরশীদ ওই সংগঠনের সহ-সভাপতি। সংগঠনটি বিএনপি-সমর্থিত।
এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে মিরপুর-১-এর রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২০০ জনের বেশি মানুষ একত্র হয়ে হামলা চালায়। তারা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে। এ সময় একটি এক্সকাভেটর দিয়ে হাসপাতালের কিছু অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আক্তার হানিফ মিয়াকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ এ পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, কিন্তু প্রধান আসামি এখনো পলাতক। বিএনপি সূত্র জানায়, হানিফ মিয়া ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য। শাহ আলী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রেজাউর রহমান জানান, তাঁকে ও অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।
চতুর্থ ঘটনাটি ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজ হাউজিং প্রকল্পে। সেখানে ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল হামলা চালায়। তারা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিও, আবাসন কোম্পানির অফিস এবং নির্মাণাধীন একটি স্থাপনায় ভাঙচুর করে।
ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, রিয়েল এস্টেট কোম্পানিটির সঙ্গে এক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার জমি নিয়ে বিরোধ আছে। ওই কর্মকর্তার পক্ষে একদল মানুষ রাতে জমির দখল নিতে গিয়ে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনায় ভাঙচুর চালায়।
মামলায় শাহরিয়ার মাহমুদকে প্রধান আসামি এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিনকে চার নম্বর আসামি করা হয়েছে। ওই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি গিয়াস উদ্দিন জানান, প্রধান আসামিসহ মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের ধরতে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
এই ঘটনাগুলোর কয়েকটি দিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রথমত, গ্রেপ্তারের ধরন। প্রতিটি ঘটনায় মাঠপর্যায়ের অংশগ্রহণকারীরা ধরা পড়ছেন, কিন্তু যাঁদের নির্দেশে বা পৃষ্ঠপোষকতায় হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ, তাঁরা নাগালের বাইরে। এতে মামলার মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ পরিকল্পনাকারীদের বিচার, অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে নির্দেশদাতাদের বিষয়ে কী তথ্য মিলছে, তা জানানো জরুরি।
দ্বিতীয়ত, প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘবদ্ধ হামলার প্রশ্ন। চাঁদ উদ্যানের ঘটনা পুলিশের বিট অফিস থেকে মাত্র ১০০ ফুট দূরে ঘটেছে। কয়েকশ মানুষ একত্র হয়ে অফিস ভাঙচুর ও লুট করলেও তাৎক্ষণিক বাধা মেলেনি কেন, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আগাম গোয়েন্দা তথ্য ছিল কি না এবং টহল ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন। তিন আসামির বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যোগ থাকার তথ্য এসেছে। কিন্তু এই সংশ্লিষ্টতা কতটা সক্রিয় বা বর্তমান, তা স্পষ্ট নয়। হানিফ মিয়াকে দলের সাবেক সদস্য বলা হচ্ছে, আর খোকন বলছেন তিনি একসময় ভোলায় পদে ছিলেন। তাই অভিযোগ প্রমাণের আগে কোনো দলকে সরাসরি দায়ী করা যায় না। তবে পুলিশের নিরপেক্ষতা এখানে বড় পরীক্ষা। দলীয় পরিচয় যা-ই হোক, আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা জনগণ দেখবে।
চতুর্থত, দখলবাণিজ্যের বৃহত্তর চিত্র। জমি ও ভবন দখলের চেষ্টা রাজধানীতে নতুন নয়। এর পেছনে প্রায়ই জমি নিয়ে বিরোধ, প্রভাবশালীদের পৃষ্ঠপোষকতা ও ভাড়াটে দলবলের ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। মামলার নিষ্পত্তি ও ধৃতদের বিচার দ্রুত না হলে এই প্রবণতা থামবে না।
পঞ্চমত, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার গুরুত্ব। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা ও ওষুধ লুট এবং এক্সকাভেটর দিয়ে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা কেবল দখলের চেষ্টা নয়, জনসেবার প্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি আঘাত। এতে সাধারণ রোগীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন।
ষষ্ঠত, বিদেশে অবস্থানরত আসামির বিষয়। খুরশীদ আলম খান দেশের বাইরে থাকলে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে আইনি প্রক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়ে পুলিশের স্পষ্ট পরিকল্পনা জানানো দরকার। অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাঁর ক্ষেত্রে পুলিশ আগে যে দাবি করেছিল, তা প্রমাণে তদন্তে কতটা অগ্রগতি হয়েছে, সেটিও জনসমক্ষে আসা উচিত।
সব মিলিয়ে, ধৃতদের সংখ্যা দিয়ে অভিযানের সাফল্য মাপা যাবে না। প্রধান আসামিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের মধ্য দিয়েই বোঝা যাবে, এসব ঘটনায় আইনের শাসন কতটা কার্যকর হচ্ছে। যত দেরি হবে, ভুক্তভোগীদের আস্থা ততই কমবে এবং দখলবাজদের সাহস বাড়বে।

