স্থানীয়ভাবে এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনে সরকারের দেওয়া রেয়াতি শুল্ককর সুবিধা অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে চীনা প্রতিষ্ঠান হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেডের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, স্থানীয় উৎপাদনের শর্তে সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি এসি, ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিন আমদানি করছে। এমনকি ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ভিআরএফ (ভেরিয়েবল রেফ্রিজারেন্ট ফ্লো) এসি আনার কথাও বলা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়। প্রতিষ্ঠানটির কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি, আর এনবিআর বলছে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে এবং প্রকৃত স্থানীয় উৎপাদনকারীরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়ছে। তাঁরা হায়ার বাংলাদেশের আমদানি, উৎপাদন সক্ষমতা, ইম্পোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (আইআরসি) এবং রেয়াতি সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রতিবেদক গুলশান-১-এর কনকর্ড টাওয়ারে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গেলেও প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পরও কেউ কথা বলেননি। একটি বিতর্কিত অভিযোগে অভিযুক্ত পক্ষের ব্যাখ্যা না থাকায় চিত্রটি একপেশে থেকে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির জবাব পেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতো।
দেশে এসি শিল্প গড়ে তুলতে সরকার শুল্ক ও ভ্যাটে রেয়াতি সুবিধা দিয়ে আসছে। এর উদ্দেশ্য যন্ত্রাংশ উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আমদানিনির্ভরতা কমানো। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ সুবিধা পেতে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হয়। এসি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্টের মধ্যে অন্তত তিনটি দেশে উৎপাদনের সক্ষমতা দেখাতে হয়। কম্পোনেন্টগুলো হলো ইনডোর ইউনিট, আউটডোর ইউনিট, কনডেনসার, ইভাপোরেটর এবং সাকশন অ্যান্ড ডিসচার্জ পাইপ। শুধু উৎপাদনের ঘোষণা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, উৎপাদন লাইন ও বাস্তব সক্ষমতাও থাকতে হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হায়ার সুবিধা নেওয়ার পরও ওই কম্পোনেন্টের উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় আমদানি করছে। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট এসআরওর শর্ত পরিপালন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
আইআরসি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হায়ার বাংলাদেশের আমদানি-সংক্রান্ত নথিতে একই ই-টিআইএন ও ঠিকানার অধীনে প্রতিষ্ঠানটির নামে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও কমার্শিয়াল দুই ধরনের আইআরসি ব্যবহারের তথ্য মিলেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল আইআরসির আওতায় স্থানীয় উৎপাদনকারী হিসেবে সুবিধা নিচ্ছে, আবার কমার্শিয়াল আইআরসি ব্যবহার করে চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আনছে। একই বিআইএন ও টিআইএনের অধীনে এভাবে দুই ধরনের আইআরসি ব্যবহার বৈধ কি না এবং এর মাধ্যমে রেয়াতি সুবিধা নেওয়া হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। তাঁদের মতে, কোন কার্যক্রমে কোন আইআরসি ব্যবহৃত হয়েছে এবং কোন শুল্ককর সুবিধা নেওয়া হয়েছে, তা বিল অব এন্ট্রি ও সংশ্লিষ্ট নথি মিলিয়ে দেখা জরুরি। উল্লেখ্য, দুই ধরনের আইআরসি থাকা নিজে থেকে অবৈধ কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। বিষয়টির সমাধান নির্ভর করছে নথি যাচাইয়ের ওপর।
আমদানির পরিসংখ্যানে সন্দেহের জায়গাটি আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি চীন থেকে তিন লাখ বিটিইউ ক্ষমতার সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম এনেছে, যেগুলো মূলত ভিআরএফ এসি। এ সময়ে মোট ৯৮টি রেডিমেড সেন্ট্রাল এসি আমদানি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এগুলো ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে খালাস করা হয়েছে। সরকার শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ক্যাপিটাল মেশিনারি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা দেয়। সম্পূর্ণ তৈরি এসিকে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ দেখিয়ে আনা হলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তবে পণ্যগুলো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত মূলধনি যন্ত্র, নাকি সরাসরি বিক্রির উপযোগী তৈরি পণ্য, তা কাস্টমস নথি ও পণ্যের প্রকৃতি যাচাই করেই নির্ধারণ করতে হবে। সেন্ট্রাল এসি কোনো কারখানার প্রয়োজনে আনা হয়ে থাকলে তা ভিন্ন হিসাবের বিষয়, প্রতিবেদনে সে ব্যাখ্যা নেই।
এসি ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটি ৩৬৯ লিটার ধারণক্ষমতার ১৪৮টি রেডিমেড চেস্ট ফ্রিজার এনেছে। পাশাপাশি আমদানি হয়েছে ৪৪৮টি এসি কম্প্রেসার ও ৪৪৮টি এসি মোটর। এখানে একটি পার্থক্য লক্ষ করার মতো। কম্প্রেসার ও মোটর উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে আমদানি হতে পারে, যা স্থানীয় সংযোজনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। কিন্তু তৈরি ফ্রিজার আমদানি ভিন্ন প্রশ্ন তোলে। তবে কোন শুল্কহারে এসব আনা হয়েছে, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
ওয়াশিং মেশিনের আমদানিতে সংখ্যা আরও বড়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সাত থেকে ১৪ কেজি ধারণক্ষমতার বিভিন্ন মডেলের মোট ৪৫ হাজার ৬৪টি ওয়াশিং মেশিন আমদানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বছরভিত্তিক হিসাবে ২০২৪ সালে ৭ হাজার ৫২২টি, ২০২৫ সালে ২০ হাজার ৪৬১টি এবং ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৬ হাজার ২৬৪টি এসেছে। সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে ২০২৫ সালে। এখানে তথ্যগত অসংগতি আছে। প্রতিবেদনে ২০২০ সালে ১০ হাজার ৮১৭টির কথা আছে, অথচ হিসাবের সময়সীমা ২০২৩ থেকে। চারটি সংখ্যা যোগ করলে মোট ৪৫ হাজার ৬৪টিই হয়, তবে ২০২০ সালের পরিবর্তে ২০২৩ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। প্রতিবেদনটি যাচাইয়ের সময় এই সংখ্যা মূল সূত্র থেকে নিশ্চিত করা দরকার।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, স্থানীয় উৎপাদনের জন্য নির্ধারিত সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আমদানি সরকারের শিল্পনীতির উদ্দেশ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় উৎপাদকদের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য, কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদনকারী হিসেবে সুবিধা নিয়ে একই সঙ্গে তৈরি পণ্য এনে বাজারজাত করলে প্রকৃত উৎপাদকেরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়েন। কারণ তাঁরা যন্ত্রপাতি, উৎপাদন লাইন ও প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করেন, ফলে তাঁদের খরচ তুলনামূলক বেশি পড়ে। এতে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে এই বক্তব্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর, যাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত। তাই এর ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে দেওয়া সুবিধা যদি তৈরি পণ্য আমদানিতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে শিল্পনীতির উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে, সঙ্গে রাজস্ব আদায় ও ন্যায্য প্রতিযোগিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁদের মত, এ ধরনের অভিযোগের নিষ্পত্তি অনুমান বা প্রতিদ্বন্দ্বীর বক্তব্যে নয়, বরং আমদানি নথি, উৎপাদন রেকর্ড, কারখানার সক্ষমতা ও সুবিধার শর্ত যাচাইয়ের মাধ্যমে হওয়া উচিত।
এনবিআরের একজন সদস্য জানিয়েছেন, শিল্প গড়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি বাড়াতে সরকার এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনে রেয়াতি সুবিধা দিচ্ছে, যার প্রধান শর্ত স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্য উৎপাদন। কোনো প্রতিষ্ঠান শর্ত ভেঙে কাঁচামাল বা যন্ত্রপাতির নামে তৈরি পণ্য এনে সুবিধা নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। হায়ার এমন সুবিধা নিয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। তৈরি পণ্যকে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণার সুযোগ নেই বলেও তিনি জানান। কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেট বিষয়টি যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেবে। কোন সময়সীমার মধ্যে তদন্ত হবে, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
সব মিলিয়ে বিষয়টির সমাধান নির্ভর করছে নথি যাচাইয়ের ওপর। বিল অব এন্ট্রি, আইআরসি, উৎপাদন সক্ষমতা ও শুল্ক পরিশোধের তথ্য মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে অভিযোগ কতটা ভিত্তিহীন বা সত্য। একই সঙ্গে হায়ার বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যাখ্যা প্রকাশ হওয়া জরুরি। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ ও ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি রেয়াতি সুবিধার তদারকি জোরদার করার প্রশ্নও সামনে আসবে।

