বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দীর্ঘায়িত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও অদক্ষতার কারণে বিদেশি ঋণের বিপরীতে গুনতে হচ্ছে লক্ষ লক্ষ ডলার কমিটমেন্ট ফি। বিশেষত, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ছাড় না হওয়া অর্থের জন্য এই ফি দিতে বাধ্য হচ্ছে দেশ।
কমিটমেন্ট ফি একটি অর্থনৈতিক মাশুল, যা ঋণদাতাদের কাছ থেকে একটি ক্রেডিট লাইন বা ঋণের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখার বিনিময়ে ধার্য করা হয়। সাধারণত, এই ফি নির্ধারণ করা হয় ঋণের অব্যবহৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে।
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১১ সালে অনুমোদিত পাওয়ার সিস্টেম ইফিসিয়েন্সি ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প, যা ২০১৭ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা বারবার সময় বাড়িয়ে এখনো চলমান। এই প্রকল্পের বিলম্বের কারণে বাংলাদেশকে ২.৭৩ মিলিয়ন ডলার বা ঋণের আকারের ০.৯৪ শতাংশ কমিটমেন্ট ফি পরিশোধ করতে হয়েছে।
কমিটমেন্ট ফি এবং প্রকল্পের বিলম্ব-
বাংলাদেশে প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘ সময়ের ফলে মুদ্রাস্ফীতি, বিনিময় হারের ওঠানামা এবং নির্মাণ ব্যয়ের বৃদ্ধি-এই সবকিছুই ঋণের প্রকৃত খরচ বাড়াচ্ছে। এডিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে দেরির কারণে খরচ প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে গেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক কর্মকর্তা জানান- “প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারার কারণে দেশকে এই মাশুল দিতে হচ্ছে। বাস্তবায়নকারী সংস্থার অদক্ষতা এবং প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বহীনতাই এ জন্য দায়ী। পাঁচ বছরের প্রকল্প বাস্তবায়নে ১০ বছর লাগানো এখন যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।”
এডিবি এবং অন্যান্য বৈশ্বিক ঋণদাতাদের ফি-
এডিবি সাধারণত কমিটমেন্ট ফি ধার্য করে ০.১৮ থেকে ১.১৮ শতাংশ পর্যন্ত, যেখানে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ০.২৫ থেকে ০.৫০ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাংক ০.৫ শতাংশ ফি আরোপ করে। ঋণচুক্তির ৬০-৯০ দিনের মধ্যে প্রকল্প কার্যকর না হলে এই ফি আরোপিত হয়।
এডিবি-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশ মোট ৩.৯৭৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণের বিপরীতে ২৩.৫৪ মিলিয়ন ডলার কমিটমেন্ট ফি পরিশোধ করেছে। ধীর প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব এবং দীর্ঘ মেয়াদি প্রকল্পের কারণেই এই অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।
এছাড়া, সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কোঅপারেশন রেলওয়ে কানেক্টিভিটি প্রকল্প এবং আখাউড়া-লাকসাম ডাবল ট্র্যাক প্রকল্পেও দেরি এবং ধীর অর্থ ছাড়ের কারণে কমিটমেন্ট ফি বেড়েছে। এই প্রকল্পে ৩.২৪ মিলিয়ন ডলার ফি ধার্য হয়েছে, যা নিট ঋণের ১.১৮ শতাংশ।
উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি-
এডিবির ২০১২ সালের ‘গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প’ ছিল এ ধরনের একটি উদাহরণ। প্রকল্পটি ২০১৭ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দেরির কারণে প্রকল্পের খরচ ৪৯৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা মূল অনুমোদনের তুলনায় ৯৪ শতাংশ বেশি।
একইভাবে, ২০১৩ সালের ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্প’ এখনো চলমান। এর সময়সীমা বারবার বাড়ানোর ফলে প্রকল্পের চুক্তি মূল্য ৩৬.৭ শতাংশ বেড়ে গেছে।
এআইআইবি এবং বিশ্বব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি-
এআইআইবি ২০১৬ সালে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রথম প্রকল্প শুরু করে। এখন পর্যন্ত এই ব্যাংক থেকে ১১.৫৬ মিলিয়ন ডলার কমিটমেন্ট ফি পরিশোধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের স্কেল-আপ ফ্যাসিলিটি (এসইউএফ) ঋণের জন্য বাংলাদেশকে ৫.৭৬ মিলিয়ন ডলার ফি দিতে হয়েছে।
বৈদেশিক ঋণের কমিটমেন্ট ফি বাংলাদেশের জন্য একটি অপ্রয়োজনীয় অথচ বাধ্যতামূলক ব্যয় হিসেবে উপস্থিত হচ্ছে। প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন এবং অদক্ষতা হ্রাসের মাধ্যমে এই ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নতুবা বিদেশি ঋণগুলোর অতিরিক্ত মাশুল বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে আরও চাপের মধ্যে ফেলবে।

