কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলাম ও তার পরিবারের তিন সদস্যের নামে কানাডার বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৪৩ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে শেখ নূর ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের করসংক্রান্ত বিষয় খতিয়ে দেখছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল এবং আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট।
সংশ্লিষ্ট নয়জনের কর ফাঁকির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
সিআইসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সালমান মুক্তাদিরকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে এই অনুসন্ধানের সম্পর্ক নেই। এটি সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ।
বিএফআইইউর তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান
ওই কর্মকর্তা জানান, ২০ জুন নূর ইসলামের পরিবারের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়। এর আগে এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নূর ইসলামের আয়কর নথিতে বেশ কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে। ২০২৪ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে তিনি রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে ৯৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা আনার তথ্য দেখিয়েছেন।
ওই বছর তার সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয় ১০৪ কোটি টাকা। এর বিপরীতে তিনি ৬৯ লাখ টাকা আয়কর দিয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এর আগের ২০২৩ থেকে ২০২৪ অর্থবছরে তার সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। সে বছর তিনি ৫ কোটি টাকা কর দেন বলে আয়কর নথিতে তথ্য রয়েছে।
বিদেশের সম্পদের তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা
আয়কর আইনে বাংলাদেশি করদাতাদের বিদেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য রিটার্নে দেখানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
কোনো করদাতার দেশে সম্পদের পরিমাণ কম হলেও বিদেশে সম্পদ থাকলে সেটিও রিটার্নে উল্লেখ করতে হয়। বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য গোপন করলে আইনে জরিমানার বিধান রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, জরিমানা পরিশোধ না করলে কর কর্তৃপক্ষ দেশে বা বিদেশে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পদ ক্রোক, বাজেয়াপ্ত বা বিক্রি করতে পারে। প্রয়োজনে এনবিআর দেশে ও বিদেশে তদন্ত করে তথ্য সংগ্রহের আইনি পদক্ষেপও নিতে পারে।
বাংলাদেশে ১৪ কোম্পানির পরিচালক
আয়কর নথি অনুযায়ী, শেখ নূর ইসলাম বাংলাদেশে ১৪টি কোম্পানির পরিচালক। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডমিনোজ পিজা, ফুওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস, এসআই ট্রাভেলস অ্যান্ড কার্গো সার্ভিসেস এবং ইস্টার্ন হোটেল অ্যান্ড বার।
এ ছাড়া টাভার্স সাপ্লায়ার্স, রেডিও মাসালা, পল বেকারি অ্যান্ড ক্যাফে রেস্টুরেন্ট, ডমিনাস অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি, স্পাইস টেলিভিশন, কয়লা পাব ও স্টারবার ক্যাফের সঙ্গেও তার নাম রয়েছে।
ফুওয়াং ডমিনোজ প্রোপার্টিজ, স্পাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট এবং টিম হর্টনস লিমিটেডের পরিচালক হিসেবেও তার নাম রয়েছে। কৃষি খাতেও তার বিনিয়োগ রয়েছে বলে আয়কর নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কানাডার ব্যাংকে বড় অঙ্কের লেনদেন
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নূর ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের কানাডার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৫০ লাখের বেশি কানাডিয়ান ডলারের লেনদেন হয়েছে।
এই সময়ে মোট ১৬৫টি আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৭টি সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট এবং দুটি সন্দেহজনক লেনদেনের চেষ্টা বা ব্যর্থ লেনদেনের তথ্য রয়েছে।
এ ছাড়া ১১৮টি বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন, ২৬টি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার এবং দুটি সীমান্ত পারাপারের মুদ্রা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এসব লেনদেনে কানাডিয়ান ডলারের পাশাপাশি ব্রিটিশ পাউন্ড, মার্কিন ডলার, সিঙ্গাপুরি ডলার ও থাই বাথ ব্যবহার করা হয়েছে বলে তথ্য রয়েছে।
কানাডায়ও ব্যবসা রয়েছে
শেখ নূর ইসলামের কানাডাতেও ব্যবসা রয়েছে। তিনি সেখানে জুম জুম পিজার মালিক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার স্ত্রী শিলা ইসলাম ডমিনোজ পিজার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
তাদের মেয়ে দিশা ইসলাম সান লাইফের ইনভেস্টমেন্ট কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করছেন বলে তথ্য রয়েছে। আরেক মেয়ে তাসনিম ইসলাম ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধিত।
বাংলাদেশে কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউজ টস বন্ডের পরিচালক হিসেবেও নূর ইসলাম, শিলা ইসলাম ও তাসনিম ইসলামের নাম রয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের একাধিক ব্যাংক হিসাব
সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নূর ইসলামের পরিবারের সদস্যরা কানাডার বিভিন্ন ব্যাংকে একক ও যৌথ নামে একাধিক হিসাব পরিচালনা করেন।
টরন্টো ডমিনিয়ন ব্যাংকে নূর ইসলাম, শিলা ইসলাম ও দিশা ইসলামের নামে একটি যৌথ হিসাব রয়েছে। ব্যাংক অব মন্ট্রিলে শিলা ও দিশার নামে একটি যৌথ হিসাব পাওয়া গেছে।
একই ব্যাংকে শিলা ইসলাম ও তাসনিম ইসলামের নামে একাধিক যৌথ হিসাব রয়েছে। টিডি ব্যাংকেও দিশা ও তাসনিমের নামে যৌথ হিসাব পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া হোম ট্রাস্ট কোম্পানিতে শিলা ইসলামের নামে একটি মর্টগেজ হিসাব রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অর্থ স্থানান্তর ও কর ফাঁকির অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, কানাডার নাগরিকত্ব এবং সেখানে থাকা স্থাবর সম্পদের তথ্য নূর ইসলাম আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেননি। কানাডায় অর্থ স্থানান্তরের কাগজপত্রও রিটার্নের সঙ্গে জমা দেওয়া হয়নি বলে তারা জানান। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকেও অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়নি বলে কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পাওয়া নথি বিশ্লেষণে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর এবং কানাডায় সম্পদ গড়ার বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাংক হিসাবের পূর্ণ তথ্য হাতে পাওয়ার পর অর্থ স্থানান্তর ও কর ফাঁকির প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে বলে তারা মনে করছেন।

