বর্তমান সময়ে দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। পেঁয়াজ, আলু, ভোজ্যতেলসহ সবজির দাম বেড়ে ক্রেতাদের যেন অসহায় করে তুলেছে। কয়েক মাস ধরেই এ চিত্র যেন স্থায়ী হয়ে উঠেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে কিন্তু বাস্তবে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট সেই আদেশ মানতে নারাজ। ফলে ভোক্তারা বাজারে গিয়ে চড়া মূল্যে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
পণ্যের বর্তমান দাম ও পরিস্থিতি-
রাজধানীর বাজার ঘুরে জানা গেছে- প্রতি কেজি পেঁয়াজ এখন ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নতুন আলুর কেজি ৯০-১০০ টাকা, আর পুরোনো আলুর দাম ৭০-৮০ টাকা। সবজির ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি। অধিকাংশ সবজি কেজি প্রতি ৬০-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, কিছু সবজি এমনকি ১০০ টাকার বেশি। বেগুন, করলা, বরবটি, শিমের মতো নিত্য প্রয়োজনীয় সবজির দামও ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। টমেটোর কেজি ১২০-১৪০ টাকা, গাজর ১৩০ টাকা এবং শালগম ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে থাকা মো. আল আমিন নামে একজন ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাজারে এলেই হাহাকার লাগে। সবকিছুর দাম বাড়তি। পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
কারসাজি ও সিন্ডিকেটের ভূমিকা-
ব্যবসায়ীদের অসাধু কারসাজি এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এই সমস্যার প্রধান কারণ বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। বিশেষ করে আলুর বাজারে সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয়। ভারত থেকে আমদানি করা আলুর আমদানি খরচ কেজি প্রতি ২১-৩০ টাকা হলেও, দেশীয় পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে ৭৫-১০০ টাকায়। আমদানিকারক ও আড়তদারদের সিন্ডিকেট এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। খোলা সয়াবিনের দাম লিটারে ১৬৫-১৬৮ টাকা এবং পাম তেল ১৫৭-১৫৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও দুই সপ্তাহ আগে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট কাটানোর জন্য সরকার ভোজ্যতেল আমদানিতে মূসক কমিয়ে ৫ শতাংশ করেছিল। কিন্তু তেলের সরবরাহ ফের কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি খুব একটা উন্নতি হয়নি।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশনের মতামত-
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাবেক সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, “ব্যবসায়ীদের কাছে ক্রেতারা জিম্মি হয়ে পড়েছে। এমনকি তারা সরকারের নির্দেশও মানছে না। তদারকি সংস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।”
তাঁর মতে, পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। যারা এসব নিয়ম কার্যকর করবে, তারাও অসাধু চক্রের কাছে অসহায়। ফলে সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই সুফল পাচ্ছে না।
সরকারি পদক্ষেপ ও বাস্তবতা-
সরকারি তদারকির দাবি থাকলেও বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে এবং অসঙ্গতির জন্য জরিমানা আরোপ করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে জরিমানা যথেষ্ট নয়। এবার জরিমানার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান বন্ধের কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এই সমস্যার সমাধান কোথায়?
বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে তুলে ধরছে যে, বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদী এবং কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন। তদারকির পাশাপাশি সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় বাজারে চলমান এই অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হবে, যা দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য আরও বড় সংকট তৈরি করবে।
সরকারের পাশাপাশি ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোও এ বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। নতুবা ক্রেতাদের এই অসহায় অবস্থার অবসান হবে না।

