নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার করে ৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। কাগজে-কলমে রপ্তানি দেখানো হলেও সরেজমিন অভিযানে কারখানায় উৎপাদনের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। উৎপাদনের জন্য বসানো যন্ত্রপাতিও অব্যবহৃত অবস্থায় স্তূপ করে ফেলে রাখা ছিল। এনবিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গোপন খবরের ভিত্তিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের একটি প্রিভেনটিভ টিম সিদ্ধিরগঞ্জের মিজিমিজি দক্ষিণ পাড়ার ইউএজিএম বিডি লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায়। প্রতিষ্ঠানটি কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর আওতাধীন একটি প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান।
বন্ড সুবিধা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পিভিসি ফ্লেক্স, পিভিসি ফিল্ম, পেট ফিল্ম, কৃত্রিম চামড়া, ডুপ্লেক্স বোর্ড ও কালার বোর্ডসহ নানা কাঁচামাল শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করত। নিয়ম অনুযায়ী এসব কাঁচামাল দিয়ে পণ্য তৈরি করে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে রপ্তানির কথা। প্রতিষ্ঠানটি কাগজে সেভাবেই রপ্তানি দেখিয়ে আসছিল।
অভিযানে কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত উৎপাদনের সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব মিলিয়ে দেখেন। সংগৃহীত বিদ্যুৎ বিল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘোষিত উৎপাদনের তুলনায় বিদ্যুতের ব্যবহার ছিল একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কারখানায় বিকল্প বিদ্যুৎ সংযোগ, সৌরবিদ্যুৎ বা গ্যাসচালিত উৎপাদনব্যবস্থার অস্তিত্বও মেলেনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, উৎপাদনসংশ্লিষ্ট যন্ত্রগুলো পুরোপুরি অব্যবহৃত অবস্থায় জমা করে রাখা হয়েছে। কারখানার প্রোডাকশন ফ্লোরেও নিয়মিত উৎপাদন চালানোর মতো জায়গা রাখা হয়নি। তাহলে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল দিয়ে রপ্তানিযোগ্য পণ্য কোথায় তৈরি হলো, এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি বন্ড কমিশনারেট থেকে ইউটিলাইজেশন পারমিশন (ইউপি) নিয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে রপ্তানি দেখালেও বাস্তবে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা কাঁচামাল অবৈধভাবে স্থানীয় খোলাবাজারে বিক্রি করেছে।
অভিযানের পর আমদানির তথ্য, উৎপাদন সক্ষমতা, বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব, ইউপি ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণ করে প্রিভেনটিভ টিম ৮৫ কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯৫ টাকা রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে। এ অভিযোগে মামলা প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থার জন্য কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে পাঠানো হয়েছে।
এনবিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই সুবিধার অপব্যবহার করে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হলে সরকার বিপুল রাজস্ব হারায়। একই সঙ্গে নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, বন্ডের অপব্যবহার রোধ ও শুল্ক ফাঁকি শনাক্তে গোয়েন্দা অধিদপ্তরের নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
ঘটনাটি দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু আমদানি-রপ্তানির কাগজপত্র যাচাই করে বন্ড জালিয়াতি ধরা কঠিন। বিদ্যুৎ ব্যবহারের মতো বাস্তব সূচক এবং কারখানার প্রকৃত সক্ষমতা মিলিয়ে দেখলে অনিয়মের চিত্র অনেক স্পষ্ট হয়। বন্ড সুবিধা দেওয়ার পর নিয়মিত সরেজমিন তদারকি না থাকলে একই ধরনের ফাঁকির সুযোগ অন্য প্রতিষ্ঠানেও তৈরি হতে পারে।
এখন নজর থাকবে বন্ড কমিশনারেটের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকে। প্রতিষ্ঠানটির বন্ড সুবিধা বাতিল হবে কি না, ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব আদায় কীভাবে হবে এবং এর পেছনে আর কারা জড়িত, সে বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে কিছু জানানো হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষের কোনো বক্তব্যও প্রতিবেদনে নেই।

