দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য কাটছাঁট করার পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত পর্যায়ে। সামাজিক অগ্রগতির দিকে মনোযোগ দিয়ে নতুন বাজেট প্রণয়ন করতে চায় সরকার, যেখানে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি আয়বর্ধক উদ্যোগ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রচলিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি–কেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেল থেকে সরে আসা হবে। এর পরিবর্তে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এজন্য সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সমান বাজেট বরাদ্দ রাখার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার এডিপি থেকে তা কমিয়ে ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটিতে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনৈতিক লক্ষ্যের বাস্তবতা ও সংকটময় পরিস্থিতি-
২০২৪–২৫ অর্থবছরের জন্য সরকার ৬.৭৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ ছাড়াবে না। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় এটি দুই অঙ্কে থাকার সম্ভাবনা প্রবল। চলতি বছরের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ১০.৮৭ শতাংশে, যা খাদ্য পণ্যে ১২.৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়ালেও এতে মূল্যস্ফীতিতে রাশ টানা সম্ভব হয়নি।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং এডিবি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে ৪–৪.৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, এই পূর্বাভাস দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন। তবে তিনি সতর্ক করেছেন যে, সরকারি ব্যয়ে অতিরিক্ত কাটছাঁট অর্থনৈতিক স্থবিরতা বাড়াতে পারে।
উন্নয়ন ব্যয়ে সংকোচন ও পরিকল্পনা-
সরকার আগামী অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেট কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হার ছিল মাত্র ৭.৯ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর প্রেক্ষিতে, নতুন কোনো মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হবে না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুরুতেই ছোট এডিপি বরাদ্দ দিয়ে বাস্তবায়ন হার বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করা হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া প্রকল্পগুলো বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিল করলে ব্যয় সংকোচন সম্ভব হলেও স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো অপরিহার্য।’
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার-
আগামী বাজেটের প্রধান লক্ষ্য থাকবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। খাদ্যপণ্য সরবরাহ বৃদ্ধি, উৎপাদন ও আমদানি সহজীকরণ এবং কৃষি ও শিল্পখাতে প্রণোদনা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থায় সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন- আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৯–৯.৫ শতাংশের নিচে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে তা বাস্তবসম্মত হবে না। সংকোচনমূলক আর্থিক নীতি এবং স্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে সাধারণ মানুষ সুফল থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজস্ব ঘাটতি ও কর-বহির্ভূত আয়ের পরিকল্পনা-
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩০ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। যদিও এই সময়ে রাজস্ব আয় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কর-বহির্ভূত আয় বাড়াতে জোর দেওয়া হবে। তবে চার লাখ কোটির বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য বাস্তবায়ন এনবিআরের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিশেষ উদ্যোগ-
সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যাংক খাতে সংস্কারের পরিকল্পনা করছে। খেলাপি ঋণ রোধ এবং তারল্য সংকট মোকাবিলায় নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান বাড়ানো এবং বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে নীতি সুবিধা দেওয়া হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ১০ বছরের কর অব্যাহতি সুবিধা এর মধ্যে অন্যতম।
ড. ফাহমিদা খাতুন সতর্ক করে বলেছেন, বাজেট সংকোচনের ফলে কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দিতে পারে। তিনি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। টিসিবি ও ওএমএস ট্রাকের দীর্ঘ লাইনের মাধ্যমে মানুষের দুর্দশা স্পষ্ট হয়েছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে কর্মসূচির বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো জরুরি।
সামাজিক অগ্রগতির বাজেট দর্শন-
সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পরিবর্তন করে আয়বর্ধক উদ্যোগ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ন্যায়সঙ্গত বাজার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করছে। আসন্ন বাজেটে সংকোচনমূলক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট কৌশল গ্রহণের প্রত্যাশা রয়েছে।
২ ডিসেম্বর আর্থিক, মুদ্রা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের সভায় চলতি ও আগামী অর্থবছরের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

