আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের ব্যয়ের বড় একটি অংশ চলে যেতে পারে সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে। এতে একদিকে যেমন বাজেটের ভার বাড়বে, অন্যদিকে ঋণের চাপও আরও তীব্র হতে পারে—এমনই ইঙ্গিত মিলছে অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে।
অর্থ বিভাগের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বাজেটে এসব খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ২৭ দশমিক ৮৫ শতাংশই যাবে এই খাতে।
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ব্যয় বাড়ছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ৮ দশমিক ৩৭।
তবে এই হিসাব আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, জ্বালানি আমদানির সম্ভাব্য ব্যয় এখনো পুরোপুরি যুক্ত হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের বোঝাও বাড়বে। এতে সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকি খাতে নির্ধারিত ব্যয় আরও ফুলে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
এর বাইরে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নও ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ১০ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রাজস্ব, মুদ্রা ও বিনিময় হার সংক্রান্ত সমন্বয় পরিষদের বৈঠকে এসব প্রক্ষেপণ তুলে ধরা হয়। বৈঠকের নথি অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ধরা হতে পারে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল ২ লাখ কোটি টাকা বা জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
এই ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—দুই উৎস থেকেই ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি এবং বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।
বিশেষভাবে লক্ষণীয়, বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চ সুদের অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপ কমাতেই সরকার ক্রমশ বিদেশি ঋণের দিকে ঝুঁকছে।
এদিকে শুধু সুদ পরিশোধেই আগামী বাজেটে ব্যয় ধরা হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ২৭ হাজার কোটি টাকা। তবে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
ভর্তুকি খাতেও বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের প্রস্তুতি রয়েছে। প্রস্তাবিত হিসাবে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি, এলএনজি খাতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি, সারে ২৭ হাজার কোটি এবং খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। সব মিলিয়ে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তায় মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে বেশি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শুধু চলতি অর্থবছরের মার্চ থেকে জুন সময়েই বৈশ্বিক জ্বালানি দামের কারণে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির চাপ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে কৃষি, রপ্তানি ও পাট খাতে প্রণোদনা অপরিবর্তিত রাখা হলেও প্রবাসী আয় বাড়াতে রেমিট্যান্স প্রণোদনা ৮০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

