রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে বাংলা নববর্ষকে ঘিরে শুরু হয়েছে সাত দিনব্যাপী বৈশাখী আয়োজন। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বৈচিত্র্যময় পণ্য নিয়ে জমে উঠেছে ‘বৈশাখী মেলা ১৪৩৩’। উদ্যোক্তা, ক্রেতা আর দর্শনার্থীদের মিলনে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং বাংলা একাডেমির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ মেলার উদ্বোধন হয়েছে গতকাল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। মেলা চলবে আগামী ২০ এপ্রিল পর্যন্ত।
প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তারা অংশ নিয়েছেন। মোট ১৪৬টি প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছে। মেলা ঘুরে দেখা যায়, কৃষিজাত পণ্য থেকে শুরু করে কারুশিল্প, পাট ও চামড়াজাত দ্রব্য, লোকজ সামগ্রী—সবকিছুরই সমাহার রয়েছে। পাশাপাশি জামদানি, শতরঞ্জি ও শীতলপাটির মতো জিআই পণ্যও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে। কুটির শিল্পজাত হস্ত ও মৃৎপণ্য, সাজসজ্জার উপকরণ এবং বিভিন্ন লোকজ খাদ্যপণ্যের স্টলেও ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। প্রথম দিন থেকেই বেচাকেনায় ব্যস্ত সময় পার করেছেন বিক্রেতা ও ক্রেতারা।
মেলায় অংশ নেওয়া উদ্যোক্তাদের মধ্যে আছেন পটুয়াখালীর বাউফলের নারী উদ্যোক্তা শাহনাজ। ২০১১ সাল থেকে টাঙ্গাইলের শাড়ি ও কাপড় নিয়ে তিনি নিয়মিত এই মেলায় অংশ নিচ্ছেন। এবারও তার স্টলে ৩০০ থেকে কয়েক হাজার টাকার বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। গত কয়েক বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে এবারের মেলায় ভালো বিক্রির আশায় আছেন তিনি। তার ভাষ্য, বৈশাখ ঘিরে দেশীয় পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ে, আর সেই সুযোগেই ক্রেতাদের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
একই মেলায় চুড়ি ও নারীদের প্রসাধনী বিক্রি করছেন আরেক উদ্যোক্তা ঝিনুক। তার মতে, একসময় দেশের প্রধান ব্যবসা ছিল ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। তবে সময়ের সঙ্গে বড় শিল্পের ভিড়ে অনেক কুটির শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই করতে হলে এ খাতের প্রতি আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
বিসিকের তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রায় ১৫ লাখ পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এ খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি, যার বড় অংশ নারী। জাতীয় অর্থনীতিতেও এ খাতের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। জিডিপিতে ৩ থেকে ৭ শতাংশ অবদান রাখার পাশাপাশি গ্রামীণ অঞ্চলে ৪০ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। রফতানি আয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে এ খাতের ভূমিকা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশের অর্থনীতির বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে পরিচালিত হয়, যেখানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই প্রধান চালিকাশক্তি। এই মেলা সেই অদৃশ্য খাতকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। তিনি জানান, উদ্যোক্তাদের সহায়তায় সম্প্রতি ৩০০ কোটি টাকার একটি রিভলভিং ঋণ সুবিধা চালু করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, এ ধরনের আয়োজন দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে সহায়ক। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্যের প্রসারের মাধ্যমে অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মাওলা, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব ওবায়দুর রহমান, বিসিক চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
এবারের মেলায় মোট ১৬০টি স্টল রয়েছে। এর মধ্যে চামড়াজাত পণ্যের সাতটি, জামদানি ছয়টি, নকশিকাঁথা চারটি, বস্ত্র ৪৪টি, শতরঞ্জি পাঁচটি এবং মণিপুরি শাড়ির দুটি স্টল রয়েছে। এছাড়া ১৩টি স্টলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হচ্ছে। দর্শনার্থীদের জন্য কারুশিল্পী জোন, শিশুদের রাইড, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুতুল নাচ ও বায়োস্কোপের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

