আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের করনীতি নিয়ে নতুন করে কঠোর বার্তা দিয়েছে। সংস্থাটি আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরের বাজেট থেকেই আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটিতে বিদ্যমান সব ধরনের কর-ছাড় ও ভর্তুকি ধীরে ধীরে নয়, বরং পুরোপুরি তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি পর্যায়ের উচ্চ সম্পূরক শুল্ক কমানোর দিকেও জোর দিয়েছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বসন্তকালীন বৈঠকে এ বিষয়টি গুরুত্ব পায় বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা বলছেন, আইএমএফ ‘ট্যাক্স এক্সপেনডিচার’ বা কর-ছাড়ের বর্তমান কাঠামো সম্পূর্ণ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, চলমান আলোচনায় সংস্থাটি ব্যাপক হারে কর-ছাড় প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে। ওয়াশিংটনে থাকা আরেক প্রতিনিধি একই কথা নিশ্চিত করে বলেন, আগামী বাজেট থেকেই বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে চাইছে আইএমএফ।
একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির বাড়তি চাপ সামাল দিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে অতিরিক্ত বাজেট সহায়তা চাওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে সংস্থাটি। তবে নতুন ঋণের পরিমাণ ও শর্ত এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছে। সেখানে চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে, যা জুনের মধ্যে পাওয়ার আশা করছে সরকার।
তবে এই অর্থ ছাড়ের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দিয়েছে আইএমএফ। প্রথমত, সব ধরনের কর-ছাড় বাতিল করে শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ জ্বালানি খাতে ভর্তুকি তুলে দিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। এই শর্ত পূরণ হলে চলতি অর্থবছরেই অর্থ ছাড়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার কথাও বলেছে সংস্থাটি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে এ পরিবর্তন আনা হবে।
বর্তমানে দেশে কর-ছাড়ের পরিধি বেশ বিস্তৃত। কৃষি ও খাদ্যপণ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি খাতসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভ্যাট ও শুল্কে ছাড় রয়েছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ইপিজেড, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগকারীদের জন্য কর-সুবিধা চালু আছে। রপ্তানি খাতেও দেওয়া হচ্ছে নানা প্রণোদনা। এমনকি রেমিট্যান্স আয়ের ওপর রয়েছে পূর্ণ কর অব্যাহতি।
এনবিআরের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটিতে দেওয়া ছাড়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৬৬ লাখ কোটি টাকা। একই সময়ে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ দশমিক ২৫ লাখ কোটি টাকা।
২০২২ সালে আইএমএফের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন পায় বাংলাদেশ। এর মধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যে ছাড় হয়েছে। তবে সংস্কার কার্যক্রমে অগ্রগতি ধীর হওয়ায় শেষ পর্যায়ে কিছু কিস্তি স্থগিত করা হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও এ অর্থ ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, কর-ছাড় পুরোপুরি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হঠাৎ বাস্তবায়ন করা হলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাদের মতে, এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে, মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, একসঙ্গে সব কর-ছাড় বাতিল করা যুক্তিযুক্ত নয়। তিনি ধাপে ধাপে ‘সানসেট ক্লজ’ প্রয়োগের মাধ্যমে সুবিধা কমানোর পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ও প্রভাবভিত্তিক সুবিধাগুলো পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করতে কর-ছাড় কাঠামো সংস্কার জরুরি। তবে তা হতে হবে পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে, যাতে অর্থনীতিতে ধাক্কা না লাগে।
অন্যদিকে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের স্নেহাশিস বড়ুয়া মনে করেন, আকস্মিকভাবে কর-ছাড় তুলে দিলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হবে। এতে পুঁজিবাজার অস্থির হতে পারে, রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ব্যয়-চাপজনিত মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। বিদেশি বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে হলে নীতিগত পরিবর্তনে একটি পূর্বনির্ধারিত রূপান্তরকাল রাখা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিটি কর-ছাড়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য সূচকের আওতায় আনার পরামর্শ দেন।
সরকারও করনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। ঢালাও কর-ছাড় থেকে সরে এসে পারফরম্যান্সভিত্তিক প্রণোদনা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
বর্তমানে ভ্যাটের মানক হার ১৫ শতাংশ। তবে বিভিন্ন খাতে সম্পূর্ণ বা আংশিক ছাড় এবং হ্রাসকৃত হার কার্যকর রয়েছে। অন্যদিকে আমদানি পর্যায়ে কিছু পণ্যে সম্পূরক শুল্ক ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে, যা বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই শুল্ক যৌক্তিক করার দিকেও আইএমএফের চাপ রয়েছে।

