বাংলাদেশের প্রিমিয়াম ও আমদানি নির্ভর ভোক্তা বাজার এখন ধীরে ধীরে এক ধরনের নীরব মন্দার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। যেসব দোকান একসময় বিদেশি ও উচ্চমানের পণ্যে ভরপুর ছিল, সেগুলো এখন ফাঁকা তাক, কম বিক্রি এবং হতাশ ক্রেতার চিত্র তুলে ধরছে।
খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি প্রায় একই রকম সর্বত্র—গুলশান থেকে উত্তরা, ধানমন্ডি থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত। দোকানে ক্রেতা আসছেন কম। যাঁরা আগে সহজে কেনাকাটা করতেন, এখন একটি পণ্য কিনতে চার–পাঁচটি দোকান ঘুরছেন, অনেক সময় খুঁজেও না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
গত প্রায় চার বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের নিচে নামেনি। একই সময়ে শ্রমিকদের মজুরি ৫০ মাস ধরে বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। এর মধ্যে আমদানি পণ্যের দাম অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণ বা তারও বেশি বেড়েছে। ফলে আমদানি-নির্ভর ভোক্তা বাজার কার্যত এক ধরনের মন্দার মধ্যে পড়েছে।
একসময় সুপারশপের তাক ভরে থাকত গিলেট রেজর, ফেরেরো চকলেট, হেড অ্যান্ড শোল্ডার্স শ্যাম্পু বা ওরাল-বি টুথব্রাশে। এখন অনেক দোকানে এসব পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে, কিছু পণ্য দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত। ২০২৫ সালের শুরুতে প্রায় তিন দশক ধরে বাংলাদেশে থাকা প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল তাদের গুরুত্বপূর্ণ বিতরণ চুক্তি বন্ধ করে দেয়, যা বাজারে পরিবর্তনের একটি বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বাংলাদেশের আমদানি-নির্ভর প্রিমিয়াম ভোক্তা বাজারের সবচেয়ে দীর্ঘ ও গভীর সংকটগুলোর একটি।
একটি বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, জীবনধারা ও ফ্যাশন পণ্যের বিক্রি ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। চকলেট ও খাদ্যপণ্যের আমদানিও ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গিলেট, গার্নিয়ার বা নিভিয়ার মতো ব্র্যান্ডের বিক্রিও সরবরাহ সংকট ও দাম বৃদ্ধির কারণে কমেছে।
মাত্র চার বছর আগেও কিটক্যাট, স্নিকার্স, ক্যাডবেরি ডেইরি মিল্ক বা ফেরেরো রোশের মতো চকলেট সুপারশপের শেলফে সহজলভ্য ছিল। এখন সেখানে স্থানীয় পণ্যের আধিপত্য বেশি, বিদেশি ব্র্যান্ড অনেক কমে গেছে। একটি সুপারশপের কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে একটি কিটক্যাটের দাম ছিল ২৫ টাকা, এখন তা ৫০ টাকা। ফেরেরো রোশের ২০০ গ্রাম বক্সের দাম চার বছর আগে ছিল ৭০০ টাকা, এখন তা বেড়ে প্রায় ১,৬০০ টাকা।
আরও জানা গেছে, আগে বাজারে থাকা প্রায় ৯০ শতাংশ ক্যান্ডি ছিল বিদেশি, যা এখন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আমদানিকারকরা বলছেন, কঠোর আমদানি নিয়ন্ত্রণ, ডলার সংকট, এলসি সীমাবদ্ধতা, শুল্ক বৃদ্ধি এবং টাকার অবমূল্যায়ন এই পতনের মূল কারণ। একটি বড় খুচরা চেইনের তথ্য অনুযায়ী, স্কিনকেয়ার, কসমেটিকস, শিশুদের পণ্য, চকলেট, হেয়ার কেয়ার ও গ্রুমিং পণ্যে ঘাটতি নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।
ক্রেতারাও বলছেন, কেনাকাটার অভ্যাস বদলে গেছে। কেউ কেউ নির্দিষ্ট একটি লোশন কিনতে চার–পাঁচটি সুপারশপে যাচ্ছেন। অনেকে আবার অনলাইনে পণ্য পেলেও অতিরিক্ত দাম বা দীর্ঘদিন স্টক না থাকার কারণে কিনতে পারছেন না। ব্যাংক খাতের তথ্য অনুযায়ী, বিলাসবহুল ও প্রিমিয়াম পণ্যের জন্য এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। ২০২২ সালে ডলার সংকটের সময় সরকার এসব পণ্যের আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল, যার প্রভাব এখনও বাজারে রয়ে গেছে।
ফ্যাশন ও ব্র্যান্ড বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। নাইকি, পুমা, অ্যাডিডাস, লিভাইসসহ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড আনা একটি বড় গ্রুপ জানায়, নতুন কালেকশন সময়মতো না আসায় বিক্রি কমে গেছে। ডিসকাউন্ট দিলেও পুরনো স্টক বিক্রি হচ্ছে না। সুপারশপগুলোও এখন আগের মতো প্রিমিয়াম চেহারা হারাচ্ছে। আগে যেসব শেলফে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড থাকত, সেখানে এখন স্থানীয় পণ্য বা ফাঁকা জায়গা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম স্কিনকেয়ার ও গ্রুমিং পণ্যের অংশ ৪৫ শতাংশ থেকে কমে ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কিছু পণ্যের দাম দ্বিগুণ বা তারও বেশি হওয়ায় ক্রেতারা এসব পণ্য কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। অনেকেই এখন প্রয়োজনীয় পণ্যের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে নতুন করে মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে আমদানি খরচ আরও বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক হার ১৩০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলের বাজার থেকে সরে যাওয়ায়। প্রায় তিন দশক পর তাদের গুরুত্বপূর্ণ বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, ফলে গিলেট, প্যাম্পার্স, ওলে, হুইস্পার ও ওরাল-বি পণ্যের ঘাটতি তৈরি হয়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, এলসি সীমাবদ্ধতা এবং টাকার অবমূল্যায়ন এই বাজার সংকটকে আরও গভীর করেছে। সব মিলিয়ে উচ্চ আয়ের মানুষও এখন আগের মতো ব্যয় করছেন না। তারা অপেক্ষা করছেন, তুলনা করছেন এবং শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় হলে প্রিমিয়াম পণ্য কিনছেন।

