বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের নীতি বিলম্ব ও আমদানি নির্ভরতা এখন দেশকে এক ধরনের “এনার্জি ট্র্যাপ”-এ ফেলেছে বলে সতর্ক করেছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ধীর অগ্রগতি দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ঢাকায় তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)-এর আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় এ বিষয়টি উঠে আসে। আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা এখন বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় তৈরি করছে, যা বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামায় দেশকে আরও অরক্ষিত করে তুলছে।
পিপিআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখন আর শুধু জ্বালানি সংকটে নেই, বরং এটি একটি “এনার্জি ট্র্যাপ”-এ আটকে গেছে, যা দেশের মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার জন্য হুমকি। তাঁর মতে, জ্বালানি খাত নিয়ে আলোচনা শুধু বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞতাকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার চাপ বহন করছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন খরচ নয়, বরং অনিশ্চয়তা। স্থিতিশীল খরচ হলেও তা পরিকল্পনায় সহায়তা করে, কিন্তু অনিশ্চয়তা থাকলে কোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় একটি সমন্বিত রূপান্তর কৌশল গ্রহণের ওপর তিনি জোর দেন। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কয়লা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং রিফাইনারি সক্ষমতা বাড়িয়ে একটি বহুমুখী সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।
ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম জানান, বর্তমানে দেশের প্রাথমিক জ্বালানির ৫২ শতাংশের বেশি আমদানি নির্ভর, যা চার বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি। তাঁর মতে, এই প্রবণতা দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি, কারণ এতে বৈশ্বিক দামের ওঠানামার প্রভাব সরাসরি পড়ছে।
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি দামের চাপ অব্যাহত থাকলে দেশে আরও ২.২ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। পাশাপাশি দেশে প্রতিদিন ১৫০০ থেকে ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান, এই ঘাটতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর। গ্রামীণ অনেক শিল্পকারখানায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, ফলে বিনিয়োগ করা অনেক উদ্যোক্তা টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসানাত বলেন, এই ঝুঁকি নতুন নয়। এক দশকেরও বেশি সময় আগে থেকেই এর ইঙ্গিত ছিল, কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে এখন শিল্পখাত উচ্চ ব্যয়, বিদ্যুৎ অনিশ্চয়তা এবং কার্বন-সংক্রান্ত বাণিজ্য বাধার মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রগতিতে মূল বাধা ভূমির অভাব নয়, বরং ভুল ধারণা ও নীতিগত ধীরতা। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সৌর উপকরণ ও ব্যাটারির ওপর পাঁচ বছরের কর ছাড়, সবুজ অর্থায়নের সুযোগ এবং গ্রিড ও ভূমি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
গ্রিনটেক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের উপদেষ্টা সিদ্দিক জোবায়ের জানান, ২০০৮ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, বাংলাদেশ এখনও সেই লক্ষ্য থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। তাঁর মতে, জমি বরাদ্দে বিলম্ব, দুর্বল অর্থায়ন এবং সার্বভৌম নিশ্চয়তার অভাবই এখনো বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করছে।
সব মিলিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে, নীতিগত গতি না বাড়ালে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর না ঘটালে দেশের জ্বালানি সংকট আরও গভীর হতে পারে, যা অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করবে।

