বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সংস্কার নিয়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বাস্তবায়নের প্রশ্ন। পরিকল্পনা নয়, কার্যকর প্রয়োগই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এমনটাই মনে করেন অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
আজ রোববার ঢাকায় সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)–এর নবম বার্ষিক অর্থনৈতিক সম্মেলনের এক অধিবেশনে তিনি বলেন, দেশে সংস্কার নিয়ে আলোচনা অনেক হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন সীমিত। ‘রোমান্সিং দ্য রিফর্ম: দ্য বাংলাদেশ স্টোরি’ শীর্ষক এই অধিবেশনে তিনি স্পষ্ট করে জানান, দুর্বল রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সমন্বয়ের অভাব, গোষ্ঠীস্বার্থ এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে বহু সম্ভাবনাময় উদ্যোগ মাঝপথেই থেমে যায়।
তিনি বলেন, সংস্কার শব্দটি এখন অনেকটা প্রচলিত ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন শক্ত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং দক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। তার অভিজ্ঞতায়, সংস্কারের পরিকল্পনা তৈরি করা তুলনামূলক সহজ হলেও বাস্তবায়নই সবচেয়ে কঠিন ধাপ।
সংস্কার প্রক্রিয়াকে ‘রোমান্স’-এর সঙ্গে তুলনা করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এতে যেমন আশা থাকে, তেমনি থাকে বাধা, সংগ্রাম এবং ধৈর্যের পরীক্ষা। ফলে এটি কোনো এককালীন উদ্যোগ নয়; বরং সময়, প্রেক্ষাপট, নেতৃত্ব এবং জনমতের প্রভাবের মধ্য দিয়ে এটি ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়।
তার মতে, সাধারণত সংকটময় পরিস্থিতিতেই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, বৈষম্য, দুর্নীতি কিংবা বাহ্যিক চাপ—এসব কারণেই সংস্কারের দাবি জোরালো হয়। তবে এর সফলতা নির্ভর করে পরিকল্পনার পরিধি, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, গতি এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরির ওপর।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গঠন, বেসরকারিকরণ, ভ্যাট ব্যবস্থা চালু, বিনিময় হার সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ডিজিটালাইজেশন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র প্রবর্তন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অগ্রগতি মন্থর হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন তিনি। এর পেছনে তিনি ‘লুণ্ঠনমূলক উত্তরাধিকার’-এর কথা তুলে ধরেন, যেখানে অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর যোগসাজশ বড় ভূমিকা রাখছে। এই জোট কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে বাধা তৈরি করছে এবং স্বজনপ্রীতিনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করছে।
তিনি আরও বলেন, অনেক সংস্কার উদ্যোগ শুরুতে গতি পেলেও পরে দিক হারিয়ে ফেলে। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি সরকারের ভেতরে সমন্বিত অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব, অংশীজনদের যথাযথ সম্পৃক্ত না করা এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বাধা মোকাবিলায় ব্যর্থতাকে দায়ী করেন। পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য দৃশ্যমান কোনো জবাবদিহিতার কাঠামোও গড়ে ওঠেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যাংক খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। বিশেষ করে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন সংশোধনের ফলে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকে আগের মালিকদের নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ তৈরি হওয়াকে তিনি ‘অলিগার্কিক প্রভাব’-এর প্রতিফলন হিসেবে দেখেন। তার মতে, বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় রাজনৈতিকভাবে কঠিন হলেও জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান—সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো, বাংলাদেশ ব্যাংক–এর স্বায়ত্তশাসন জোরদার, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ভর্তুকির যৌক্তিক ব্যবহার এবং সরকারি ব্যয়ের মান নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।

