মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন ও মোটরসাইকেল বাজারে। পেট্রোল ও অকটেনচালিত মোটরসাইকেল ও গাড়ি এখন অনেক ক্ষেত্রে পাম্পে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি নিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী—সবাই ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বিশেষ করে নতুন করে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির বিক্রিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা। একই সময়ে বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের চাহিদা দ্রুত বেড়ে গেছে, যেখানে বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে দেশে মোট ৩ লাখ ১৯ হাজার ১৯৩টি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই বিক্রির গতি দ্রুত কমে এসেছে। জানুয়ারিতে বিক্রি হয় ৩৪ হাজার ৫১৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৩ হাজার ৬৫৪টি এবং মার্চে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ১২টি। মার্চে রমজান ও ঈদ থাকায় স্বাভাবিকভাবেই বিক্রি কিছুটা বেশি ছিল।
কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় এপ্রিলের শুরুতেই। চলতি মাসের প্রথম ১২ দিনে মোট বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৫১০টি মোটরসাইকেল। এই হিসাবে দৈনিক বিক্রি নেমে এসেছে ৪৫৯টিতে, যেখানে মার্চে দৈনিক গড় ছিল ১ হাজার ৭৫২টি। অর্থাৎ মার্চের তুলনায় এপ্রিলের প্রথম অংশে বিক্রি কমেছে প্রায় ৭৪ শতাংশ। ফেব্রুয়ারির তুলনায় এই পতন প্রায় ৬০ শতাংশ বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায়ও বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। গত বছরের মার্চে প্রায় ৫৬ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হলেও এবার একই মাসে বিক্রি হয়েছে ৫৪ হাজার ইউনিট। এতে বছরওয়ারি হিসাবে মার্চে বিক্রি কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই প্রথম প্রান্তিকে মোট বিক্রি ছিল প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার ইউনিট। চলতি বছরে একই সময়ে বিক্রি নেমে এসেছে ১ লাখ ২৪ হাজারে। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে প্রায় ১৩ হাজার ইউনিট বা ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। টিভিএস অটোস বাংলাদেশ লিমিটেডের সিইও বিপ্লব কুমার রায় বলেন, “বর্তমানে মোটরসাইকেল বাজারে কিছুটা ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। নতুন ক্রেতারা সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছেন, ফলে বিক্রিতে প্রভাব পড়ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বাজার প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নিম্নমুখী হয়েছে।” তিনি আরও জানান, একসময় এই পতন ৬০ শতাংশ পর্যন্ত গিয়েছিল, যা ধীরে ধীরে কিছুটা পুনরুদ্ধার হচ্ছে।
এসিআই মোটরস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার হোসাইন মোহাম্মদ অপশন জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে মোটরসাইকেল বিক্রিতে ৫ থেকে ৬ শতাংশ প্রভাব পড়েছে। তবে বাজার পুরোপুরি নেতিবাচক হয়নি, বরং প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। তিনি বলেন, “আগে আমাদের বিক্রি প্রায় ২৫ শতাংশ হারে বাড়ছিল। ঈদ কেন্দ্র করে ৩০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির আশা ছিল, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তা হয়নি। তবে এখন ধীরে ধীরে উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।” তার মতে, মোটরসাইকেল এখনো একটি প্রয়োজনীয় বাহন। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াতের কারণে ক্রেতারা জ্বালানি সাশ্রয়ী মডেলের দিকে ঝুঁকছেন।
জ্বালানি সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎচালিত স্কুটার বাজারে। গত বছরের নভেম্বর থেকে এই খাতে প্রবৃদ্ধি শুরু হয়, যা এখন আরও দ্রুত গতিতে বাড়ছে। নভেম্বরে যেখানে বিক্রি ছিল ৯৬৯টি, মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২৬০টিতে। ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
ইয়াদিয়া, রিভো, আকিজ, ওয়ালটন ও রাইডোসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ড এই খাতে সক্রিয়। রানার অটোমোবাইলের চিফ বিজনেস অফিসার মুহাম্মাদ আবু হানিফ জানান, তাদের বিক্রি এক বছরে প্রায় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
তিনি বলেন, “ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল পরিবেশবান্ধব এবং খরচ অনেক কম। একবার চার্জে প্রায় ১০০ কিলোমিটার চলা যায়, যেখানে খরচ হয় মাত্র ১৪–১৫ টাকা। তুলনায় পেট্রোলচালিত বাইকে প্রতি কিলোমিটারে খরচ অনেক বেশি।” রাইডো ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে বিক্রি প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মার্কেটিং প্রধান শরীফুল ইসলাম।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু মোটরসাইকেলে নয়, হাইব্রিড ও জ্বালানিচালিত গাড়ির বাজারেও পড়েছে। বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক জানান, গাড়ি রেজিস্ট্রেশনও আগের তুলনায় কমে এসেছে। তিনি বলেন, আগে যেখানে বছরে ২০ হাজারের বেশি গাড়ি নিবন্ধিত হতো, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে তা নেমে এসেছে প্রায় ৯ হাজার ৭০০টিতে। এতে বাজারে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। তার মতে, জ্বালানি সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করেছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইলেকট্রিক গাড়ির বিক্রি কিছুটা বেড়েছে, তবে সামগ্রিক বাজারে পতনই প্রধান প্রবণতা।
বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৮ লাখের বেশি। বছরে গড়ে তিন থেকে সাড়ে চার লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সঠিক পরিস্থিতি থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বছরে ছয় লাখে পৌঁছাতে পারে। তবে বর্তমান জ্বালানি সংকট সেই প্রবৃদ্ধির গতিপথে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

