রাজস্ব ঘাটতি সামাল দিতে সরকার যখন আয় বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে বিপুল শুল্ক ও কর বকেয়ার চাপ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খাতে পেট্রোবাংলার বকেয়া শুল্ক-কর দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২৬৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এই বকেয়া জমেছে টানা ৫২ মাসে, অর্থাৎ ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্র বলছে, এই সময়ে মোট ৪৬৪টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে শুল্ক-কর পরিশোধ করা হয়নি। একই সময়ে ৬০টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে এক হাজার ৭৯৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি ৪০৪টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে এই বিপুল অঙ্কের বকেয়া তৈরি হয়েছে। কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যেখানে বকেয়া ছিল ২২২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, তা ধীরে ধীরে বেড়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি ছাড়িয়ে যায়। এ বিষয়ে এনবিআর একাধিকবার পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ শফি উদ্দিনও বকেয়া আদায়ে ব্যবস্থা নিতে এনবিআরকে লিখিতভাবে অবহিত করেছেন।
আমদানি করা এলএনজি বিশেষভাবে পরিবহনকারী কার্গো জাহাজে আসে। পরে এটি মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আনলোড করা হয়। সেখান থেকে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
এনবিআর ও কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, কাস্টমস আইন অনুযায়ী বিল অব এন্ট্রি ও সংশ্লিষ্ট দলিল আমদানি কমিশনারেটে জমা দিতে হয়। একই সঙ্গে পণ্য খালাসের আগেই শুল্ক-কর পরিশোধ বাধ্যতামূলক। তাদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে পণ্য খালাসের পরও এক মাসের বেশি সময় ধরে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়নি, যা আইন লঙ্ঘনের শামিল।
এনবিআরের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, কাস্টমস আইন ২০২৩-এর ধারা ৮৩ ও ৮৪ অনুযায়ী বিল অব এন্ট্রি দাখিল বাধ্যতামূলক। ধারা ৯০ অনুযায়ী পণ্য খালাসের আগে শুল্ক-কর পরিশোধ করতে হবে। তবে পেট্রোবাংলার ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে আরও বলা হয়, আইন অনুযায়ী বকেয়া শুল্ক-করের ওপর মাসিক ১ শতাংশ হারে সুদ প্রযোজ্য হবে।
পেট্রোবাংলার দাবি, এখানে দ্বৈত করের বিষয় রয়েছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, “এখানে দ্বৈত করের কিছু বিষয় আছে। আমরা বন্দরে কর দিচ্ছি। আবার গ্রাহকের কাছে বিক্রির সময় তারা কর দিচ্ছে। ফলে একই জিনিসে দুইবার কর নেওয়া হচ্ছে।”
সংস্থাটির আর্থিক পরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমান জানান, মোট বকেয়ার মধ্যে ৮ হাজার ১০৩ কোটি টাকা তারা কখনো গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি। তিনি বলেন, এই অংশটি মূলত সাবসিডি ও বিভিন্ন সরকারি পাওনার সঙ্গে সম্পর্কিত। বাকি প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা জ্বালানি বিভাগ, বিদ্যুৎ ও সার খাতের পাওনা এবং ভর্তুকি সংক্রান্ত।
পেট্রোবাংলার আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এলএনজি আমদানির সময় ভ্যাট দিতে হয়, আবার গ্যাস আকারে সরবরাহের সময়ও ভ্যাট দিতে হয়, ফলে একই পণ্যে দুইবার করের চাপ তৈরি হচ্ছে। এছাড়া অগ্রিম আয়কর (এআইটি) হিসেবে দেওয়া অর্থের কিছু অংশ ফেরত পাওয়ার কথা থাকলেও তা ফেরত পাওয়া যায় না বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এনবিআর সূত্র বলছে, নিয়মিত চিঠি ও টেলিফোন যোগাযোগের পরও ২০২৫ সালের আগস্টের পর কোনো বকেয়া পরিশোধ করা হয়নি। এর আগে ২০২২ সালে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছিল, যার জবাব পেট্রোবাংলা দেয়নি। পরিস্থিতি না বদলালে কাস্টমস আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের বিন লক, পণ্য খালাস বন্ধ এবং ব্যাংক হিসাব জব্দের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছিল। এক শীর্ষ এনবিআর কর্মকর্তা বলেন, বিল অব এন্ট্রি দাখিল না করেই পণ্য খালাস কাস্টমস আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। দীর্ঘদিন বকেয়া থাকায় অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে সমন্বয়েও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
কাস্টমসের মতে, বিপুল এই বকেয়া অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাজস্ব ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমও এতে ব্যাহত হচ্ছে। সব মিলিয়ে এলএনজি আমদানি ঘিরে দ্বৈত করের অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি বকেয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতা—সবকিছু মিলিয়ে পেট্রোবাংলা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

