দেশে জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি প্রভাব ফেলছে ভোক্তাদের ব্যয়ে। ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম বাড়ার ফলে আগামী এক বছরে গ্রাহকদের অতিরিক্ত প্রায় ১১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। জ্বালানির চাহিদা, সরবরাহ ও মূল্য বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার প্রভাবকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে সরকার গত রবিবার থেকে নতুন দাম কার্যকর করেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে চার ধরনের জ্বালানির মোট ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক প্রবণতা ধরে রাখলে আগামী বছরে জ্বালানির ব্যবহার প্রায় ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। সে হিসেবে এক বছরে ডিজেলের ব্যবহার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৬৯ কোটি লিটার, অকটেন ৬১ কোটি ৭৮ লাখ লিটার, পেট্রোল ৬৮ কোটি ৭৪ লাখ লিটার এবং কেরোসিন ৯ কোটি ২৭ লাখ লিটার।
নতুন দামে এই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে বছরে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮৪ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা, যা আগের দামের তুলনায় ১১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা বেশি। আগের দামে এই ব্যয় ছিল প্রায় ৭৩ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গতি বাড়লে চাহিদা আরও বাড়তে পারে, আবার আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অবনতি হলে তা কমতেও পারে।
চার জ্বালানির মধ্যে ডিজেলের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। মোট ব্যবহারের ৬০ শতাংশেরও বেশি এই জ্বালানি। নতুন দামে বছরে ডিজেল কিনতেই ব্যয় হতে পারে প্রায় ৬৫ হাজার ৫১০ কোটি টাকা, যা আগের তুলনায় ৮ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা বেশি। পরিবহন, কৃষি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার থাকায় এর মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে।
অকটেন ও পেট্রোলের দাম বাড়ায় ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। অকটেনে বছরে ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা, যা আগের তুলনায় ১ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা বেশি। পেট্রোলে ব্যয় হবে প্রায় ৯ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, বাড়তি ১ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা। এতে শহুরে মধ্যবিত্তের যাতায়াত ব্যয়, রাইড শেয়ারিং এবং মোটরসাইকেলভিত্তিক সেবার খরচ বাড়বে।
কেরোসিনের ব্যবহার তুলনামূলক কম হলেও এর প্রভাব পড়ে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। বছরে প্রায় ১ হাজার ২০৬ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে, যা আগের তুলনায় ১৬৭ কোটি টাকা বেশি। গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায় বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় কেরোসিন ব্যবহারের কারণে এ মূল্যবৃদ্ধি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যয় আরও বাড়াতে পারে।
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি ইতোমধ্যে বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। কিছু এলাকায় পণ্য পরিবহন ও যাত্রী ভাড়া বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। কৃষিতে সেচ ব্যয় বাড়তে পারে, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনেও খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে জ্বালানি ব্যয় মোট উৎপাদন খরচের একটি সীমিত অংশ হওয়ায় পণ্যমূল্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম।

