দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। পরিবহন ভাড়া বাড়াতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সঙ্গে বৈঠকে বসে পরিবহন মালিক সমিতি। এতে বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব বিস্তার করবে, মূল্যস্ফীতি বা কতটা বাড়বে? পরিস্থিতির উত্তরণে সরকারেরই বা করণীয় কী— এসব নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কথা বলেছেন।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি না করলে ভালো হতো। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতিজনিত প্রতিক্রিয়াটা বেশি হবে। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে। মূল্যবৃদ্ধি জ্বালানি তেলের প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে না। সরকারের বাড়তি খরচের চাপ কিছুটা প্রশমন করতে পারে। দাম বাড়ানো সরকারের নিরুপায় উদ্যোগ।
প্রশ্ন: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে?
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: যে মাত্রায় মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে সেই মাত্রায় যেন ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যের সমন্বয় হয়। অর্থাৎ ডিজেলের মূল্যের সঙ্গে মিলে এখন যেন পরিবহন ভাড়া অযৌক্তিকভাবে বেশি না বেড়ে যায়। ঠিক একইভাবে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি মাথায় রেখে যেন আবার সেচের খরচ অযৌক্তিকভাবে বেশি না বাড়ে। সুতরাং সরকারকে ওই সমন্বয়ের জায়গাগুলোয় নজর রাখতে হবে। সেটা যদি সরকার ঠিকমতো করতে না পারে তাহলে মূল্যস্ফীতির প্রতিক্রিয়া আরও বেশি হবে। যতটুকু হওয়ার কথা তার থেকে আরও বেশি প্রভাব পড়বে। সুতরাং সেই জায়গাগুলোর দিকে নজর রাখা প্রয়োজন।
প্রশ্ন: পরিবহন খরচ বৃদ্ধির মাধ্যমে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির যে চেইন রিঅ্যাকশন—এটা কতটা গভীর হতে পারে?
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি তো অবশ্যই হবে। আমাদের দেশে যেহেতু সাপ্লাই চেইনগুলোর ওপর সরকারের নজরদারি খুব দুর্বল, এমনকি সরকার এবং বাজারে যেভাবে মূল্য নির্ধারণ হয় সেই মূল্য নির্ধারণ কাঠামোগুলো খুব বেশি বিজ্ঞানসম্মত না এবং এগুলো প্রপার তথ্যভিত্তিকও হয় না। এগুলো একেবারেই বড় ব্যবসায়ীদের এক ধরনের প্রভাব এবং তাদের ইচ্ছাধীন একটা বিষয় হয়ে গেছে।
সুতরাং সেই জায়গায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে বিভিন্ন ধরনের যুক্তি, অজুহাত ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলে এখন সেই মূল্য আরও বেশি বাড়ানোর এক ধরনের চাপ রয়েছে সরকারের ওপর। সেজন্য সরকার যেন সব পক্ষের সঙ্গে বসে এবং অযৌক্তিক দাবিগুলো যেন পরিহার করে। এই মুহূর্তে ভোক্তার ওপর যেন কোনো অযৌক্তিকভাবে বর্ধিত অনেক বেশি মূল্যবৃদ্ধির চাপ না পড়ে সেটা নজরে রাখতে হবে।
প্রশ্ন: এই পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে কার্যকর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয় কী হতে পারে?
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: অলরেডি তো সরকার স্বল্পমেয়াদি থেকে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় ঢুকেছে। তবে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে সরকারের উচিত হবে এই জ্বালানিনির্ভরতা থেকে কীভাবে বের হওয়া যায়। আমদানি জ্বালানিনির্ভরতা, যেমন আমদানি করা ডিজেল দিয়ে যেন সেচ না করতে হয় সেটার জন্য সৌরভিত্তিক সেচে যাওয়া। পরিবহন খাতে ডিজেলের ব্যবহার কমানোর জন্য ইভি কারকে প্রমোট করা, সরকারের পাবলিক প্রকিউরমেন্টে বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি কার) অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে এবং প্রকিউরমেন্টে ইভি কার বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
একইভাবে শিল্প কারখানার ক্ষেত্রেও যেন এই যে জেনারেটর দিয়ে, ডিজেলভিত্তিক জেনারেটর দিয়ে যেন বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে রুফটপ সোলার দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সহজতর করা হয়। এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জটা হলো, এগুলো করতে গেলে যে ধরনের সাপোর্ট সরকারের দিক থেকে পাওয়ার কথা দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ ধরনের সাপোর্ট তারা পাচ্ছেন না। একটা গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট আগামী বাজেটে আসা উচিত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌর, বায়ুবিদ্যুৎ বা অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সব ধরনের পার্টস ইকুইপমেন্ট কম্পোনেন্টের ক্ষেত্রে ট্যারিফ যেন শূন্য শুল্কে নিয়ে আসে। এই কাজটা আগামী বাজেটে করতে পারে।
প্রশ্ন: বর্তমান পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য বড় ঝুঁকিগুলো কী?
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: প্রথমতো যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, যদিও এটা একটা অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ। কিন্তু তারপরে যদি এটা প্রলম্বিত হয় এবং হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে সময় লাগে তাহলে জ্বালানির প্রাপ্যতা, এলএনজি প্রাপ্যতা এবং অন্যান্য উদ্যোগ যদি নিতে দেরি হয় তাহলে মূল্যস্ফীতির প্রতিক্রিয়া বেড়ে প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত হতে পারে। একইভাবে জিডিপিতে এর প্রভাব পড়তে পারে ০ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত। ইন্টারেস্ট রেট বাড়তে পারে প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত। একইভাবে টাকার আরও ডিভ্যালু হতে পারে। এই বিষয়গুলোর আশঙ্কা আছে। সুতরাং সরকারকে এখনই প্র্যাগমেটিক পলিসি নিতে হবে। সূত্র: জাগো নিউজ

