ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে স্বল্পমেয়াদে দ্রুত স্বস্তির পথ এখন সরকারের সামনে নেই। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই এই চাপ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার কৌশল নেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তাৎক্ষণিক সমাধান নয়, বরং ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব অর্থনীতির পাশাপাশি সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। ব্যয় বাড়ায় স্বস্তি ফেরানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
নতুন পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলপত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রণীত খসড়া ইতিমধ্যে উপদেষ্টা পরিষদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি এখন চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
কৌশল অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৩ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক আর্থিক ও মুদ্রানীতির সমন্বয় বৈঠকে আরও দ্রুত ফল পাওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। সেখানে আলোচনায় এসেছে, আগামী অর্থবছরেই মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর সম্ভাবনা বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আগামী দুই মাসে একাধিক বৈঠক ও আলোচনার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মতামত নিয়ে কৌশলপত্রটি চূড়ান্ত করা হবে।
অন্যদিকে দেশে দীর্ঘদিন ধরেই মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ বেড়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে তা আরও বেশি ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে সেবা খাত—সবখানেই ব্যয় বাড়ছে সমানভাবে।
এই চাপের মধ্যেই জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সামনে বিদ্যুতের দাম আরও এক দফা বাড়তে পারে এমন ইঙ্গিতও মিলছে। ফলে ব্যয় আরও বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে এক অঙ্কে থাকা মূল্যস্ফীতি আবারও দুই অঙ্কের দিকে যেতে পারে। বাস্তব অবস্থা বলছে, ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দ্রুত থামার সম্ভাবনা কম।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, আগামী দুই থেকে তিন মাসে মূল্যস্ফীতি ১০ থেকে ১১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তাঁর মতে, ব্যবসার পরিবেশে বড় পরিবর্তন না এলে এবং আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল না হলে আগামী চার বছরেও ৫ শতাংশে নামানো কঠিন হবে।
কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি বাড়ানো হবে। পাশাপাশি আর্থিক ও মুদ্রানীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য আনার চেষ্টা থাকবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অর্জন কঠিন। তাঁর মতে, শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্য ও আমদানিনির্ভর পণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, নতুন কৌশলপত্রে বাস্তবভিত্তিক ও অর্জনযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।

