দেশে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শিল্পখাতে নতুন গতি আনতে সরকার ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৫’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এ নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করেছে এবং সংশ্লিষ্টদের মতামত সংগ্রহের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় কার্বন নিঃসরণ কমানো, জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করা এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির একটি সমন্বিত কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) খাতকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে রূপান্তরের রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছে।
নীতিমালায় ইভি ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন কর সুবিধার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ১ শতাংশ হারে সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি আরোপ এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ২০৪০ সাল পর্যন্ত আয়কর অব্যাহতি। পাশাপাশি লেড ব্যাটারি ও লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনেও কর ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের নীতি, আইন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অনুবিভাগের যুগ্মসচিব সুলতানা ইয়াসমীন জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই নীতিমালাটি চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে ইলেকট্রিক ভেহিকেলের ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। খসড়া ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে এবং দ্রুতই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা শেষে এটি চূড়ান্ত করা হবে।
নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পরিবহন খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানো জরুরি। বর্তমানে বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের অন্যতম বড় উৎস পরিবহন খাত। এই প্রেক্ষাপটে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর যানবাহনের বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক ভেহিকেলের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালার ভিশনে ইভি শিল্পকে একটি শক্তিশালী ও টেকসই খাতে রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। আর মিশনে রয়েছে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ২০৩০ সালের মধ্যে পরিবহন খাতে উল্লেখযোগ্য হারে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া স্থানীয়ভাবে ইভি উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানির সুযোগ তৈরি এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে, যা বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবহন খাতের উচ্চ কার্বন নিঃসরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে, তাই ইভি ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর যানবাহনের ব্যবহার কমানো। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ইভি খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কর সুবিধা ও প্রণোদনার একটি প্যাকেজ প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ইভি নিবন্ধন ফি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো, ২০৩০ সাল পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর অব্যাহতি, আমদানিতে কম শুল্কহার এবং ২০৪০ সাল পর্যন্ত আয়কর ছাড় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতেও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চার্জিং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সারাদেশে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে চার্জিং সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। নতুন ভবন নির্মাণেও ইভি চার্জিং সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও নীতিমালায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইভির নিবন্ধন, ফিটনেস ও মান নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন অনুসরণ করা হবে। তিন চাকাবিশিষ্ট ইলেকট্রিক যান, যা ‘ইজি বাইক’ নামে পরিচিত, সেগুলোকে বিআরটিএ নির্ধারিত মান ও পরীক্ষার মাধ্যমে নিবন্ধনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া ডিলার, আমদানিকারক বা উৎপাদনকারীরা নিবন্ধন ছাড়া কোনো ইলেকট্রিক থ্রিহুইলার বা মোটরসাইকেল ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি ব্যবহারে ইভি অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও নির্দেশনা রাখা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নতুন যানবাহনের অন্তত ৩০ শতাংশ ইভি হতে হবে।
নীতিমালার বাস্তবায়ন তদারকিতে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল শিল্প উন্নয়ন কাউন্সিল’ গঠন করা হবে। পাশাপাশি বাস্তবায়ন ও কারিগরি কমিটি গঠন করা হবে। গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র স্থাপন এবং কারিগরি শিক্ষায় ইভি বিষয় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিমালাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে পরিবেশ সুরক্ষা, জ্বালানি সাশ্রয়, শিল্পায়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ইভি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

