বাজেট প্রণয়নের নতুন নির্দেশনায় কৌশলগত লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে অর্থ বিভাগ। এতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করেই ব্যয় কাঠামো সাজানোর কথা বলা হয়েছে।
নির্ধারিত বাজেট কাঠামোতে সরকারের কৌশলগত উদ্দেশ্য, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, নির্বাচনি ইশতেহার এবং ২০২৬ সালের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, নারী ও শিশু উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা। এসব খাতে ব্যয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পরিপত্রে ব্যয়সীমা নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে নির্ধারিত ব্যয়সীমাই চূড়ান্ত এবং এর বাইরে অতিরিক্ত বরাদ্দের সুযোগ নেই। কোনো খাতে অর্থ সংকট দেখা দিলে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাদ দিয়ে বেশি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পে অর্থায়ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও সরকারি সহায়তা পাওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিজস্ব আয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিজস্ব আয় বাদ দিয়ে যে পরিমাণ সহায়তা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে হবে এবং সরকারি সহায়তা যতটা সম্ভব সীমিত রাখতে বলা হয়েছে।
সব মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের জন্য আইবাস প্লাস প্লাস (iBAS++) সিস্টেমে তথ্য এন্ট্রি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্ধারিত ফরম ব্যবহার করে বাজেট প্রাক্কলন ও প্রক্ষেপণের তথ্য দিতে হবে। রাজস্ব, পরিচালন ব্যয় এবং উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য আলাদা ফরম নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান সংক্রান্ত তথ্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রক্ষেপণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
উন্নয়ন বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রেও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রাক্কলন ও প্রক্ষেপণ তৈরির সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনে প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ পুনর্বিবেচনা করা যাবে, তবে কোনোভাবেই নির্ধারিত মোট এডিপি ব্যয়সীমা অতিক্রম করা যাবে না।
মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য নির্ধারিত ব্যয়সীমার মধ্যেই বৈদেশিক ঋণ, অনুদান (ডিপিএল/আরপিএল) এবং নগদ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এসব ব্যয় বিবেচনায় নিয়েই প্রকল্পের প্রাক্কলন ও প্রক্ষেপণ প্রস্তুত করতে হবে। অতিরিক্ত বরাদ্দের সুযোগ রাখা হয়নি।
প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রেও সতর্কতা আরোপ করা হয়েছে। কোনো প্রকল্পের বরাদ্দ নির্ধারণের সময় তার অনুমোদিত মোট ব্যয় ও মেয়াদ অতিক্রম না হয়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করে পরিকল্পনা কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এ সময় প্রকল্পের সম্ভাব্য ফলাফল এবং অর্থনীতিতে তার প্রভাব বিবেচনা করা হবে।
এডিপিভুক্ত প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন সংশোধন বা পুনঃপ্রণয়নের জন্য নির্ধারিত ফরম-৮ (খ-১) ব্যবহার করতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থনৈতিক কোড অনুযায়ী বিস্তারিতভাবে এন্ট্রি দিতে হবে। প্রকল্প দলিলে উল্লেখ নেই এমন কোডে বরাদ্দ দেখানো যাবে না। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অননুমোদিত প্রকল্পের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা যাবে না।
তবে পরবর্তী দুই অর্থবছর ২০২৭-২৮ ও ২০২৮-২৯-এর প্রক্ষেপণে অনুমোদিত ও সম্ভাব্য অননুমোদিত সব প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেখাতে হবে। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান পাওয়ার সুবিধার্থে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে নীতিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিযোগ্য প্রকল্পগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাজেট প্রণয়নের পাশাপাশি তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতেও নতুন নির্দেশনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, কেবল কাগজে-কলমে পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপকে সময়ভিত্তিকভাবে সাজাতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সময় নির্ধারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে কোয়ার্টারভিত্তিক বরাদ্দ নির্ধারণ করতে হবে, যাতে ব্যয়ের গতি ও কার্যকারিতা বাড়ে। এর মাধ্যমে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেট অনুমোদন ও যাচাই প্রক্রিয়াও ধাপে ধাপে সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। অধিদপ্তর ও সংস্থাগুলো প্রথমে নিজ নিজ বাজেট ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন নেবে। এরপর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ের বাজেট ওয়ার্কিং গ্রুপ তা যাচাই করে পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মতামতের জন্য পাঠাবে। সবশেষে বাজেট ব্যবস্থাপনা কমিটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে।
রাজস্ব ও প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নতুন দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সংস্কারের অংশ হিসেবে কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক নির্দিষ্ট কার্যক্রমের বিপরীতে অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। সাধারণভাবে থোক বরাদ্দ প্রস্তাব করার সুযোগ রাখা হয়নি।
স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার ক্ষেত্রে বরাদ্দ নির্ধারণে তাদের নিজস্ব আয়ের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের আয় ও আয়ের উৎস বিবেচনায় নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সভায় নির্ধারিত প্রাক্কলিত ও প্রক্ষেপিত আয় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরে দেখাতে হবে। নিজস্ব আয় বাদ দিয়ে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী অর্থনৈতিক কোড অনুসারে বিস্তারিত বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।
একইভাবে সরকারি সহায়তা পাওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও নিজস্ব আয় বিবেচনায় ব্যয়সীমা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। সরকারি সহায়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রেখে তার ভিত্তিতেই বাজেট প্রাক্কলন ও প্রক্ষেপণ প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।