দেশের কর ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সব খাতে একক ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান।
গতকাল মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআরের প্রধান কার্যালয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। তার ভাষ্য, সবার জন্য একই মানের ভ্যাট হার কার্যকর করা হবে। তবে যাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তারা নির্দিষ্ট রেয়াত সুবিধা পাবেন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হলেও এ দিকেই এগোবে সরকার।
সভায় তিনি আরও স্পষ্ট করেন, ভ্যাট হার ১৫ শতাংশই রাখা হবে এবং আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) নিয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। বর্তমানে দেশে ১৫ শতাংশকে মানদণ্ড ধরা হলেও বিভিন্ন খাতে কম হারে বা ট্রাঙ্কেটেড ভ্যাট চালু রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির পর এসব সুবিধা চালু করা হয়। তবে উন্নয়ন সহযোগীরা মনে করছেন, এতে ভ্যাট কাঠামো জটিল ও বিকৃত হয়ে পড়ছে। একক হার চালুর পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সুপারিশের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ভ্যাট আদায়ে অনুগত্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তার মতে, একদল করদাতা নিয়ম মেনে ভ্যাট দিচ্ছেন, অন্যরা দিচ্ছেন না। এতে সৎ করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে প্রণীত ভ্যাট আইনে একক হার নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছিল। কিন্তু পরে ব্যবসায়ী মহলের চাপের মুখে বিভিন্ন খাতে ভিন্ন ভিন্ন হার চালু করে সেই অবস্থান থেকে সরে আসে সরকার।
একই বৈঠকে ‘মিস ডিক্লারেশন’ বা পণ্যের ভুল মূল্য ঘোষণার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের অনিয়মের কারণে সৎ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি মহসিন ভূঁইয়া বলেন, ভুল ঘোষণার কারণে সৎ ব্যবসায়ীরা ব্যবসা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এ দায় কি শুধু ব্যবসায়ীদের, নাকি অন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষেরও ভূমিকা রয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া আমদানিকারকরা জানান, কাস্টমস হাউজগুলোতে অনেক সময় পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য ধরে মূল্যায়ন করা হয়। ফলে আমদানি কর বাড়ে এবং এর প্রভাব পড়ে বাজারমূল্যে। বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের এক প্রতিনিধি বলেন, সোলার প্যানেলের ক্ষেত্রে আমদানি মূল্যের প্রায় তিনগুণ পর্যন্ত ধরে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এতে করের বোঝা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
একই ধরনের অভিযোগ করেন ট্রান্সফরমার ও সুইচগিয়ার প্রস্তুতকারকদের সংগঠনের প্রতিনিধি। তার দাবি, ১,৪০০ ডলারের একটি যন্ত্রাংশকে ২,৮০০ ডলার ধরে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, যা করের পরিমাণ দ্বিগুণ করে দিচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, অনেকের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে সৎভাবে ব্যবসা করা কঠিন। তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, কর ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে সবার মধ্যে অনুগত্য নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, কেউ নিয়ম না মানলে এর চাপ শেষ পর্যন্ত নিয়ম মেনে চলা করদাতাদেরই বহন করতে হয়।

