বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশ এখন নতুন করে আন্তর্জাতিক সহায়তার দিকে ঝুঁকছে। চলমান ঋণ কর্মসূচির কিস্তি ছাড়ে ধীরগতি দেখা দেওয়ায় সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে তৈরি হওয়া আর্থিক চাপ মোকাবিলায় সরকার মোট ৩০০ কোটি ডলারের ঋণ পাওয়ার লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে আইএমএফ থেকে ২০০ কোটি ডলার এবং বিশ্বব্যাংক থেকে ১০০ কোটি ডলার জরুরি সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজস্ব ঘাটতি—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফ ইতোমধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলারের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকও ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের একটি তহবিল রেখেছে। বাংলাদেশ আশা করছে, তুলনামূলক সহজ শর্তে এই তহবিল থেকে অর্থ পাওয়া সম্ভব হবে।
বর্তমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত কিস্তি ছাড়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। আর্থিক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারে ধীরগতির কারণে আইএমএফ তাদের পর্যালোচনা মিশন এপ্রিলের বদলে জুলাইয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে জুনের আগেই দুই কিস্তিতে ১৩০ কোটি ডলার পাওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে।
এটি শুধু অর্থপ্রাপ্তির বিলম্ব নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ আইএমএফের অর্থ ছাড় না হলে অন্যান্য দাতা সংস্থার অর্থায়নও প্রায়শই বাধাগ্রস্ত হয়।
নতুন ঋণ পেতে গেলে বাংলাদেশকে বেশ কিছু কঠিন শর্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম সমন্বয়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছাড়া ভর্তুকি কমানো বা তুলে নেওয়া, কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস এবং ভ্যাটের অভিন্ন হার চালু করা।
এছাড়া ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। আইএমএফ সরকারের কিছু ব্যয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়েও আপত্তি তুলেছে, যা আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে এবং বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা, করছাড় কমানো এবং অটোমেশন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে কিছু বড় সংস্কার এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। যেমন—জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে পুনর্গঠন করে আলাদা নীতিনির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ তৈরির পরিকল্পনা এখনো কার্যকর হয়নি। যদিও শিগগিরই এ বিষয়ে নতুন আইন আনার উদ্যোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে, যা পরে ২০২৫ সালের জুনে বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পাওয়া গেছে, আর বাকি রয়েছে ১৮৬ কোটি ডলার।
কিন্তু বর্তমান সরকার মনে করছে, আগের চুক্তির কিছু শর্ত বর্তমান বাস্তবতায় পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। ফলে নতুন করে আলোচনা ও দরকষাকষির মাধ্যমে শর্তগুলো কিছুটা শিথিল করার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন এক ধরনের দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে দ্রুত অর্থের প্রয়োজন, অন্যদিকে কঠিন শর্তের চাপ। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে এমন একটি ভারসাম্য খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যাবে, আবার সামাজিক প্রভাবও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
নতুন ঋণ পাওয়া গেলে তা স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতিকে স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সংস্কার বাস্তবায়ন ছাড়া এই চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।

