চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার একটি অস্বস্তিকর চিত্র সামনে এসেছে। জুলাই থেকে মার্চ—এই সময়ের হিসাব বলছে, সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে। সংখ্যাটি শুধু বড়ই নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি সতর্ক সংকেতও বটে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা বেশি—তখন আদায় হয়েছিল ২ লাখ ৫৯ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১.১৫ শতাংশ। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে। মার্চ পর্যন্ত সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, যার বিপরীতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা।
এই ঘাটতির প্রবণতা আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে মাসভিত্তিক হিসাব দেখলে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেখানে ঘাটতি ছিল ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা, সেখানে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে গেছে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ ঘাটতি কমার কোনো লক্ষণ তো নেইই, বরং দ্রুতগতিতে বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা—এই তিনটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি মন্থর হয়ে পড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজস্ব আদায়ে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণেও একই চিত্র। আয়কর, ভ্যাট এবং শুল্ক—এই তিনটি প্রধান উৎসেই প্রবৃদ্ধি থাকলেও কোনো ক্ষেত্রেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। আয়করে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১.২৫ শতাংশ, ভ্যাটে ১৩.৬৬ শতাংশ এবং শুল্কে ৭.৭৭ শতাংশ।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—সংখ্যার দিক থেকে এই প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যপূরণে যথেষ্ট নয়। ৯ মাসে আয়করের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৬ কোটি টাকা, অথচ আদায় হয়েছে মাত্র ৮০ হাজার ২২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ভ্যাটে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ১৩৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা। আর শুল্ক খাতে ১ লাখ ৩৯ হাজার ১১৮ কোটি ২৩ লাখ টাকার বিপরীতে এসেছে ৯৮ হাজার ৫০১ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
অর্থাৎ তিনটি বড় খাতেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে বড় ধরনের পিছিয়ে থাকা—যা সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
গত অর্থবছরের পুরো হিসাবের সঙ্গে তুলনা করলে পরিস্থিতি আরও চিন্তার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। অথচ এবার ৯ মাসেই সেই অঙ্ক প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। তখন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, আর আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ৩৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা।
মাসভিত্তিক পারফরম্যান্সও আশাব্যঞ্জক নয়। মার্চ মাসে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২.৬৭ শতাংশ, যা জানুয়ারির ৩.২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়েও কম। মার্চে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০ হাজার ৫০ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ৩৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকা—অর্থাৎ অর্ধেকের কাছাকাছি।
এখানেই বড় প্রশ্ন উঠে আসে—সমস্যাটা কোথায়? শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতি, নাকি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও দায়ী?
বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা, করজালের সীমাবদ্ধতা, কর ফাঁকি এবং অর্থনীতির অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিস্তার—সবকিছু মিলিয়েই এই ঘাটতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। শুধু লক্ষ্যমাত্রা বাড়ালেই হবে না, সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন দরকার।
চলতি অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বর্তমান প্রবণতা বলছে, এই লক্ষ্য অর্জন করা এখন বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে, রাজস্ব ঘাটতির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি দেশের অর্থনীতির ভেতরে জমে থাকা চাপের প্রতিফলন। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ঘাটতি ভবিষ্যতে আরও বড় আর্থিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

