দেশের ভোজ্যতেল বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে সয়াবিন তেলের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা বাজারে সরবরাহ ও দামের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর একই সময়ে যেখানে সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছিল প্রায় ৪ লাখ ৪৮ হাজার টন, সেখানে এবার তা নেমে এসেছে ২ লাখ ৬১ হাজার টনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে বড় ব্যবধানে। অন্যদিকে পাম তেলের আমদানি প্রায় স্থিতিশীল রয়েছে, তবে সয়াবিন তেলের এই পতন পুরো ভোজ্যতেল বাজারে ভারসাম্য নষ্ট করছে।
আমদানিকারকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও দেশের বাজারে সেই অনুযায়ী দাম সমন্বয় না হওয়ায় তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন। ফলে নতুন করে আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, লোকসান দিয়ে দীর্ঘদিন ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্যও একই চিত্র তুলে ধরছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১ হাজার ১৫৪ ডলার, যা ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে ১ হাজার ২৮২ ডলার এবং মার্চে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৮২ ডলারে। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে ধারাবাহিকভাবে দাম বাড়লেও দেশের বাজারে সমন্বয় না হওয়ায় চাপ তৈরি হয়েছে আমদানিকারকদের ওপর।
শিল্প খাতের বড় একটি অংশ এখন সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা করছে। একাধিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বলছে, প্রতি লিটার তেলে তাদের ২০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। এমনকি একটি বড় চালানে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়ার কথাও বলা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক কোম্পানি স্বাভাবিক মজুত ধরে রাখতে পারছে না।
ফলে বাজারে এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দেখা দিতে শুরু করেছে। কিছু এলাকায় বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে গেছে। একই সঙ্গে খোলা তেলের দাম সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দেশের বার্ষিক ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ টন, যার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি নির্ভর। ফলে আমদানিতে যে কোনো ধীরগতি সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব ফেলে। বর্তমানে সেই চাপ ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে।
তবে সরকারের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সতর্ক। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান আমদানি পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল এবং বড় ধরনের কোনো সংকট দেখা দেয়নি। প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
সরকারি পর্যবেক্ষণে বলা হচ্ছে, বোতলজাত তেলের গায়ে নির্ধারিত মূল্য লেখা থাকায় সেখানে কারসাজির সুযোগ সীমিত। তবে একই সঙ্গে স্বীকার করা হয়েছে, বাজারে সরবরাহ কিছুটা কমে এসেছে এবং খোলা তেল নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি মূলত তিনটি কারণে তৈরি হয়েছে—বিশ্ববাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি, দেশীয় বাজারে দাম সমন্বয়ের বিলম্ব এবং আমদানিকারকদের লোকসানের চাপ। এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করায় সরবরাহ চেইনে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আমদানি নির্ভরতা বেশি হওয়ায় এই খাত খুবই সংবেদনশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য পরিবর্তনও দেশের বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, সয়াবিন তেলের আমদানি হ্রাস এখন শুধু একটি বাণিজ্যিক বিষয় নয়, বরং এটি ভোক্তা বাজার, মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও সরাসরি চাপ তৈরি করছে। যদি পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে সামনে ভোজ্যতেলের বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

