বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ বর্তমানে বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। একসঙ্গে তিনটি বড় ধরনের বৈদেশিক চাপ বা “ত্রিমুখী সংকট” দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে বলে জানিয়েছে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)।
এই চাপগুলোর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের আসন্ন উত্তরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির অনিশ্চয়তা। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ঢাকায় নিজেদের মাসিক ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস উপস্থাপনকালে পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, এই অনিশ্চয়তাগুলো জ্বালানি দামের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, বাণিজ্য প্রবাহ দুর্বল করছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন তৈরি করছে—যার প্রভাব পড়ছে পুরো অর্থনীতিতে।
তিনি আরও জানান, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল–ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে চাপ বাড়ছে। রপ্তানি কমে যাওয়া এবং জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই ঝুঁকি আরও গভীর হচ্ছে।
পিআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জ্বালানি আমদানির প্রায় ৩১ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, যা মূলত হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্সের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় ৪০ শতাংশ বেড়ে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ১৬ থেকে ১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
গত ১৮ মাসে অর্থনীতিতে কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেখা গেলেও তা ছিল ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বৈদেশিক মজুদ বেড়ে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমে ৮–৯ শতাংশে এসেছে এবং আমানত প্রবৃদ্ধি বেড়েছে।
তবে এই অগ্রগতির পেছনে গভীর দুর্বলতা রয়ে গেছে বলে সতর্ক করেন আশিকুর রহমান। তার মতে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা কোভিড-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে কম। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে, যার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬ শতাংশে নেমেছে।
এই পরিস্থিতিতে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখন সংস্কার কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে যাওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। তার ভাষায়, “এই পর্যায়ে অর্থনৈতিক সংস্কার থেকে সরে আসা অর্থনৈতিকভাবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। এটিকে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে।” তিনি আরও বলেন, এসব সংস্কার শুধু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর শর্ত নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, নীতিগত অনিশ্চয়তা ব্যবসার পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তার মতে, সরকারি নীতি ও ব্যবসায়িক প্রত্যাশার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে রাজনীতি ও ব্যবসা অনেক সময় আলাদা পথে চলে। অথচ বাস্তবে এগুলো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।” তিনি আরও জানান, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কম থাকায় বিদেশি বিনিয়োগও আসছে না। এমনকি যন্ত্রপাতি আমদানিও কমে গেছে, কারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা কম।
জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা, ঋণ খেলাপি হওয়ার ভয় এবং আর্থিক খাতে সীমিত প্রবেশাধিকার—সব মিলিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বিআরএসি ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো খন্দকার শাখাওয়াত আলী বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কেবল স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নয়, কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও বেসরকারি খাতের কিছু অংশের মধ্যে সম্পর্কের অস্পষ্টতা সংস্কারকে আরও জরুরি করে তুলেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে পিআরআই চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার বৈশ্বিক ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালীর মতো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সার বাণিজ্যে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এর ফলে খাদ্য, জ্বালানি ও সার আমদানির খরচ বাড়ছে এবং মূল্যস্ফীতি চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য রাজস্ব খাতে সংস্কার অপরিহার্য। রাজস্ব আহরণে ধারাবাহিক ব্যর্থতা সরকারকে ঋণের চক্রে ফেলছে, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে।
তার মতে, রাজস্ব ব্যবস্থা ঠিক না করলে অর্থনীতি টেকসই হবে না। সংস্কার বিলম্বিত হলে ভবিষ্যতে এর খরচ আরও বাড়বে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তিনি বলেন, “অর্থনীতির রক্তক্ষরণ চলতে থাকলে এবং আমরা ব্যবস্থা না নিলে পুনরুদ্ধার অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে।”

