চট্টগ্রাম বন্দরের ১৩৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে এক সাহসী প্রশাসকের নাম—ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী। প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কীভাবে ভূমিদস্যু, দুর্নীতিবাজ ও প্রভাবশালী অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া যায়, তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে আছেন তিনি।
চট্টগ্রাম বন্দরে দায়িত্ব পালনকালে মুনীর চৌধুরীকে কাছ থেকে দেখেছেন অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী। তাদের ভাষ্য, তীব্র চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব, হুমকি ও নানা বাধা উপেক্ষা করেও তিনি দায়িত্ব পালনে কখনো পিছিয়ে যাননি। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও আইন প্রয়োগে ছিলেন আপসহীন।
চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভূমি উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দেন মুনীর চৌধুরী। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অবৈধ দখলে থাকা বিপুল পরিমাণ জমি উদ্ধার করে বন্দরের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সে সময় উদ্ধার হওয়া জমি ও রাজস্বের মূল্য ছিল প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা, যার বর্তমান বাজারমূল্য কয়েকগুণ বেড়েছে। পরে এসব জমি বন্দরের সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শুধু ভূমি উদ্ধারেই নয়, জল ও স্থল—দুই ক্ষেত্রেই অসংখ্য অভিযানের মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন। ঢাকায় মেরিন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নৌপথে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেন। অতিরিক্ত মালবোঝাই, অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে বহু নৌযান আটক ও জরিমানা করা হয়। এতে নৌ চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরে আসে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
চট্টগ্রাম বন্দরে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ছিলেন অনিয়মকারীদের কাছে আতঙ্কের নাম। অন্যদিকে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে ছিলেন কঠোর কিন্তু সৎ প্রশাসক। তার অফিস ছিল অত্যন্ত সাধারণ। ব্যক্তিগত জাঁকজমক বা বিলাসিতার কোনো ছাপ ছিল না। একটি সাধারণ পিকআপ গাড়িতে করেই দিন-রাত অভিযান পরিচালনা করতেন।
পরিবেশ দূষণ, শুল্ক ফাঁকি, বন্দর আইন লঙ্ঘন, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ কিংবা নদীতীর দখলের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালান তিনি। দেশি-বিদেশি বহু জাহাজ আটক, অবৈধ ভবন উচ্ছেদ এবং কর্ণফুলী নদীর তীর দখলমুক্ত করার ঘটনাগুলো তখন ব্যাপক আলোচনায় আসে। বন্দরের শতবর্ষের ইতিহাসে বিদেশি জাহাজ আটকের মতো কঠোর পদক্ষেপ খুব কমই দেখা গিয়েছিল।
সাপ্তাহিক ছুটি বা সরকারি বন্ধের দিনেও তার অভিযান থেমে থাকত না। ওয়াকিটকি, ক্যামেরা, বাইনোকুলার ও টাগবোট নিয়ে নদীপথে টহল দিতেন নিয়মিত। নদী ও সমুদ্র দূষণকারী জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীতে অবৈধ ড্রেজিংও বন্ধ করেন তিনি। ফলে নদীপথে শৃঙ্খলা ও পরিবেশ সুরক্ষায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে।
চট্টগ্রামজুড়ে খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল, অবৈধ মজুদ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস চুরি, পাহাড় কাটা, পরিবেশ দূষণ এবং অপচিকিৎসার বিরুদ্ধেও একের পর এক অভিযান পরিচালনা করেন মুনীর চৌধুরী। বিভিন্ন সময় বিপুল পরিমাণ ভেজাল খাদ্য ও নিম্নমানের পণ্য জব্দ করা হয়। এমনকি বিদেশ থেকে আমদানি হওয়া পচা গমও জব্দ ও ধ্বংস করার ঘটনা তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একসঙ্গে বহু প্রতিষ্ঠানের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও অতিরিক্ত ভাতা গ্রহণ করতেন না তিনি। বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও ছিলেন অনাগ্রহী। একবার সরকারি সফর শেষে অব্যবহৃত অর্থ সরকারি তহবিলে ফেরত দেওয়ার ঘটনাও প্রশাসনে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত হয়।
পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়িত্ব পেয়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন মুনীর চৌধুরী। ট্র্যাপ কেস পরিচালনার মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে প্রশাসনের ভেতরেও আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, অনিয়ম কমানো এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রেও তার ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।
বিদ্যুৎ খাত, পরিবেশ অধিদপ্তর, ওয়াসা ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকালে আর্থিক ক্ষতি কমানো, রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং সেবার মান উন্নয়নে তার কর্মকাণ্ড প্রশংসিত হয়। পরিবেশ দূষণ কমাতে শিল্পকারখানায় বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা চালু এবং অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযানও ছিল আলোচিত উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও তার কিছু দুঃসাহসী অভিযানের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তবে নানা সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে তাকে বিভিন্ন দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
অনেকের মতে, প্রশাসনিক ক্ষমতার কার্যকর ও নির্ভীক প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক বিরল উদাহরণ হয়ে আছেন মুনীর চৌধুরী। তাই চট্টগ্রাম বন্দর দিবসে অনেকেই দাবি তুলছেন—তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বন্দরের কোনো জেটি, টার্মিনাল বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নাম তার নামে করা হোক।

