দেশে আয়কর রিটার্ন দাখিল না করা বিপুলসংখ্যক ই-টিআইএনধারীকে এবার ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় এনে নজরদারিতে আনছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকা তৈরি করে নন-ফাইলারদের কাছে নোটিশ পাঠানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
আজ রোববার (২৬ এপ্রিল) রাজধানীর এনবিআর ভবনে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। সভায় বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বিজিএপিএমইএ ও বিজিবিএসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ ই-টিআইএনধারী রয়েছেন। এর মধ্যে আনুমানিক ৫০ লাখ ব্যক্তি আয়কর রিটার্ন জমা দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বাকি যারা রিটার্ন জমা দেবেন না, তাদের শনাক্ত করতে ই-টিআইএন ও ই-রিটার্ন ডাটাবেজ ব্যবহার করা হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে নন-ফাইলারদের তালিকা তৈরি করে পর্যায়ক্রমে নোটিশ পাঠানো হবে।
তিনি জানান, নোটিশ পাওয়ার পরও কেউ রিটার্ন জমা না দিলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়-ব্যয়ের তথ্য যাচাই করবেন।
অডিট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়াতে এনবিআর ইতোমধ্যে ম্যানুয়াল নির্বাচন পদ্ধতি বন্ধ করেছে বলেও জানান চেয়ারম্যান। তার ভাষ্য, এখন ঝুঁকিভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় অডিট ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রথম ধাপে প্রায় ১৫ হাজার করদাতাকে র্যান্ডমভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে আরও ৬০ হাজারের বেশি করদাতা অডিটের আওতায় আসবেন। পুরো প্রক্রিয়াটি সিস্টেমনির্ভর হওয়ায় মানবীয় হস্তক্ষেপ কমবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে বলে মনে করছে এনবিআর।
ভ্যাট ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও সভায় বিস্তারিত কথা বলেন তিনি। এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, ভ্যাট অডিটের জন্য ২০টি সূচকের ভিত্তিতে ৬০০ প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা হয়েছে। পাশাপাশি বড় করদাতাদের জন্য যৌথ অডিট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যেখানে আয়কর ও ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারা একসঙ্গে কাজ করবেন।
তিনি বলেন, দেশে খুচরা পর্যায়ে ভ্যাটের আওতা এখনও অনেক সীমিত। বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধনের সংখ্যা ৮ লাখেরও কম, যা সন্তোষজনক নয়। এ পরিস্থিতি বদলাতে আইন সহজ করা এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও ব্যবহারবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নতুন ভ্যাটদাতাদের জন্য প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়েও পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। তার মতে, ছোট ব্যবসায়ীদের হয়তো প্রতি মাসে রিটার্ন জমা দিতে হবে না। নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট বছরে একবার দিলেই চলবে। এছাড়া মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অনলাইনে ভ্যাট পরিশোধের সুবিধাও রাখা হবে।
কর ও ভ্যাট ফাঁকি ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
কিউআর কোড বা বিশেষ ডিজিটাল কোড সংযুক্ত করে পণ্যের তথ্য যাচাই করা যাবে। শুরুতে তামাকজাত পণ্যে এ ব্যবস্থা চালু হলেও পরে পানির বোতল, কোমল পানীয়, সাবান, শ্যাম্পু ও চিপসসহ বিভিন্ন পণ্যে এটি সম্প্রসারণ করা হবে।
সাধারণ জনগণকেও কর ফাঁকি প্রতিরোধে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, মোবাইল ফোন দিয়ে কিউআর কোড স্ক্যান করে ভোক্তারা জানতে পারবেন কোনো পণ্য কর পরিশোধ করে বাজারে এসেছে কি না। কেউ অনিয়মের তথ্য দিলে তাকে পুরস্কৃত করার পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যানের মতে, পুরো কর ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ করা গেলে করদাতাদের হয়রানি কমবে, করের আওতা বাড়বে এবং নিয়মিত করদাতাদের ওপর চাপও কমে আসবে।

