চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় প্রত্যাশার তুলনায় কমেছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ-এর সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত এডিপি থেকে মোট ব্যয় হয়েছে ৭৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকার কিছু বেশি, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা কম।
তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ের বাস্তবায়ন হারও কিছুটা কমে এসেছে। চলতি অর্থবছরে এই হার দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশে, যেখানে আগের বছর ছিল ৩৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এর আগের বছর একই সময়ে বাস্তবায়ন হার ছিল আরও বেশি, প্রায় ৪২ শতাংশ। ফলে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন ব্যয়ের গতি মন্থর হওয়ার চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক কাঠামোতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধাক্কা লাগে। অনেক প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদার দায়িত্ব ছেড়ে যাওয়ায় কাজ থমকে যায়। নতুন করে দায়িত্ব বণ্টন, প্রকল্প পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সময় লাগায় ব্যয় কমে গেছে।
চলতি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির মোট আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু বরাদ্দের তুলনায় ব্যয়ের হার কম থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে নতুন সরকারি ক্রয়নীতির কারণে দরপত্র প্রক্রিয়া ধীর হওয়াও একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার পরিবর্তনের পর চলমান প্রকল্পগুলো নতুন করে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের আওতায় রয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে অনেকগুলো বাতিল বা সংশোধনের মুখে পড়তে পারে। ফলে অর্থবছরের বাকি সময়েও ব্যয়ের গতি দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা কম।
অর্থায়নের উৎসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৩৩ শতাংশ। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের ৪০ শতাংশের কিছু বেশি। আর সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় কম।
খাতভিত্তিক বাস্তবায়নেও বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। কিছু মন্ত্রণালয় তুলনামূলক ভালো অগ্রগতি দেখালেও কয়েকটি বড় খাত পিছিয়ে আছে। যেমন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বরাদ্দের মাত্র ২১ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে, রেল মন্ত্রণালয় প্রায় ২৪ শতাংশ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাত প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যয় করেছে। অন্যদিকে কৃষি, জ্বালানি, পানি সম্পদ ও সেতু খাত তুলনামূলক বেশি অগ্রগতি দেখিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন ব্যয়ের এই ধীরগতি স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, শুধু ব্যয়ের হার বাড়ানোর জন্য তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। বরং প্রকল্পের গুণগত মান, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেই ব্যয় বাড়ানো উচিত। এতে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।

