পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নয়, বরং দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কতদিন বিদ্যুৎ দেবে রূপপুর?
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ৬০ বছর। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের মাধ্যমে এর কার্যকাল আরও প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে।
একবার জ্বালানি লোড করলে তা দিয়ে টানা দেড় বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। ফলে প্রচলিত তেল, গ্যাস বা কয়লা নির্ভর কেন্দ্রের মতো ঘন ঘন জ্বালানি সংগ্রহের জটিলতা এখানে নেই। দেড় বছর পর পর কেন্দ্রটির এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে।
বাংলাদেশের একক প্রকল্প হিসেবে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো উদ্যোগ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। মোট ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই ঋণ হিসেবে আসছে রাশিয়া থেকে, যা আগামী ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
রূপপুরে ব্যবহৃত হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি। এটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ বাধ্যতামূলক।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. প্রীতম কুমার দাস বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ কোনো বিকল্প নয়, এটি বাধ্যতামূলক। তার ভাষায়, আইএইএর নিরাপত্তা প্রটোকল এতটাই কঠোর যে সামান্য বিচ্যুতিও পুরো প্রকল্প থামিয়ে দিতে পারে। তাই রূপপুরের দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নির্ভর করছে “জিরো এরর” বা শূন্য ত্রুটি নীতির ওপর।
তিনি আরও বলেন, ব্যবহৃত জ্বালানি বা বর্জ্য পুনরায় কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। রাশিয়ার “ফাস্ট নিউট্রন” প্রযুক্তির মতো ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইউরেনিয়ামের উপজাত থেকে নতুন জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব, যা ইতোমধ্যে রাশিয়া ও ভারতের মতো দেশে পরীক্ষিত হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যয় আরও কমে আসতে পারে।
বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শক্তি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আধুনিক প্রেক্ষাপটে এটি এখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ এতে কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। রূপপুর চালু হলে এটি বছরে কয়লা নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় প্রায় ২০ মিলিয়ন টন এবং গ্যাস নির্ভর কেন্দ্রের তুলনায় প্রায় ৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

