আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এমন এক পূর্বাভাস দিয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। সংস্থাটির অনুমান, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ভারতের তুলনায় সামান্য বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৯১১ মার্কিন ডলার। একই সময়ে ভারতের সম্ভাব্য মাথাপিছু জিডিপি ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮১২ ডলার। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ধারা, রপ্তানি আয়ের স্থিতিশীলতা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমে আসাকে এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখিয়েছে আইএমএফ।
তবে এখানে বড় পার্থক্য হলো অর্থনীতির মোট আকারে। আয়তন ও সামগ্রিক অর্থনীতির দিক থেকে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড় অবস্থানে রয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, ২০২৭ সালে আবার ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হতে পারে এবং এই প্রবণতা ২০৩১ সাল পর্যন্ত চলতে পারে।
এক বছরের হিসাবেই কি চিত্র বদলায়?
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু একটি বছরের মাথাপিছু জিডিপির তুলনা দিয়ে দুই দেশের অর্থনীতির বাস্তব চিত্র বোঝা যায় না। বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ও অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, এই সূচক অনেক সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হার ও প্রযুক্তিগত হিসাবের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
তিনি বলেন, মুদ্রার দর পরিবর্তন হলে ডলারে হিসাব করা মাথাপিছু জিডিপিও ওঠানামা করে। তাই এক বছরের ব্যবধানকে বড় অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা পশ্চাদপসরণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হানও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তার মতে, মাথাপিছু জিডিপিতে সাময়িক এগিয়ে থাকা মানেই অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। বরং প্রবৃদ্ধির গতি, বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আইএমএফের প্রতিবেদনে কী আছে:
আইএমএফের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদন বছরে দুইবার প্রকাশিত হয়। সেখানে বিশ্ব অর্থনীতির স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি চিত্র তুলে ধরা হয়। গত ১৪ এপ্রিল প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ভারতের মোট অর্থনীতির আকার ছিল প্রায় ৩ হাজার ৯১৬ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল প্রায় ৪৫৮ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ, মোট অর্থনীতির আকারে দুই দেশের মধ্যে এখনো বিশাল ব্যবধান বিদ্যমান। তবে মাথাপিছু আয়ের হিসাবে জনসংখ্যা ও মুদ্রার মানসহ বিভিন্ন কারণে অস্থায়ী পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
কেন এই পার্থক্য ওঠানামা করে:
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মাথাপিছু জিডিপির হিসাব নির্ভর করে মোট উৎপাদন ও জনসংখ্যার অনুপাতে। এই হিসাবেও আবার আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে এটি অনেক সময় অনুমাননির্ভরও হয়। ফলে আইএমএফ বা অন্যান্য সংস্থার পূর্বাভাস সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। বৈশ্বিক সংকট, যুদ্ধ পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি কিংবা বাণিজ্য প্রবাহের পরিবর্তনও এই সূচকে প্রভাব ফেলে। সেলিম রায়হানের মতে, অতীতেও দেখা গেছে বাংলাদেশ কিছু সময়ের জন্য ভারতের মাথাপিছু জিডিপিকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু সেটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত অগ্রগতির প্রতিফলন ছিল না।
মাথাপিছু জিডিপি আসলে কী বোঝায়:
মাথাপিছু জিডিপি হলো একটি দেশের মোট উৎপাদনকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করার ফল। অর্থাৎ, একটি দেশে বছরে যত পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয়, তা যদি সব মানুষের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হতো—তাহলে একজন নাগরিকের অংশ কত হতো, সেটিই মাথাপিছু জিডিপি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অর্থনৈতিক ধারণা বোঝার একটি সূচক হলেও এটি সরাসরি জীবনমানের পূর্ণ চিত্র দেয় না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ২ হাজার ৬২৫ ডলার। অন্যদিকে, বিশ্ব গড় মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১৫ হাজার ৬০০ ডলার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের এই পূর্বাভাস আলোচনার জন্ম দিলেও এটিকে চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় এসব হিসাব দ্রুত বদলে যেতে পারে। তাদের মতে, টেকসই প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানই হবে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির আসল মানদণ্ড—মাথাপিছু জিডিপির সাময়িক ওঠানামা নয়।

